
সিলিকন ভ্যালিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কাজ করা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রযুক্তিতে এমন এক অভূতপূর্ব ও অবিশ্বাস্য অগ্রগতি দেখা যেতে পারে, যা বর্তমান পৃথিবীকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। প্রযুক্তি জগতের অনেকে এই মুহূর্তটিকে সিঙ্গুলারিটির পাদদেশ বলে অভিহিত করছেন। সহজ কথায় বলতে গেলে, অদূর ভবিষ্যতে এমন একটি যুগ বা পর্যায় আসতে পারে যখন এআই নিজেই নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করবে। এর ফলস্বরূপ প্রযুক্তির উন্নয়নের গতি এত দ্রুত বাড়তে থাকবে যে একসময় তা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে বহু ক্ষেত্রে এআই মানুষের চেয়েও বহুগুণ বেশি বুদ্ধিমান ও দক্ষ হয়ে উঠবে। প্রযুক্তির এই উল্লম্ফন মানবজাতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও এর পেছনের অজানা শঙ্কাগুলো বিজ্ঞানীদের গভীর চিন্তায় ফেলে দিয়েছে।
এ ধরনের বৈপ্লবিক সম্ভাবনার কথা শুনলে একে কেউ কেউ পরম আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ দেখছেন এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের মতে, এআই একদিন মানবজাতিকে এক অসাধারণ প্রাচুর্যের যুগে নিয়ে যেতে পারে যেখানে মানুষের মৌলিক কোনো অভাব থাকবে না। তবে একই সঙ্গে তিনি এ কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা মানবজাতিকে ধ্বংস করার মতো মারাত্মক হুমকি তৈরি করতে পারে, যার পেছনে ১০ থেকে ২০ শতাংশ সম্ভাবনাও রয়েছে। অন্যদিকে, এআই খাতের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ ও বিশ্বখ্যাত গবেষক জিওফ্রি হিন্টনের আশঙ্কা আরও অনেক বেশি গভীর। ২০২৩ সালে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে মানুষ শেষ পর্যন্ত এক গভীর বিপদের মুখে পড়তে চলেছে। অতিমানবীয় বুদ্ধিমত্তা বা সুপারইন্টেলিজেন্স তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেছেন যে এর ফলে মানবসভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। যদিও তিনি নিজে এই হিসাবের শতভাগ নির্ভুলতা নিয়ে নিশ্চিত নন, তবুও এই সতর্কবার্তা প্রযুক্তি বিশ্বে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
এআই-এর এই সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা ও ভয়াবহ ঝুঁকি কেবল গবেষকদের মাঝেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে শুরু করে ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশ পর্যন্ত অনেকেই এখন এ বিষয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করছেন। শি জিনপিং স্পষ্টভাবে বলেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সব সময় মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে চীন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন গঠনের উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। তবে ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বব্যাপী এআই নিয়ন্ত্রণের জন্য কোনো সমন্বিত ও জোরালো উদ্যোগ নিতে হলে সম্ভবত বড় ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। এদিকে সাইবারসিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সির সাবেক প্রধান জেন ইস্টারলি সতর্ক করে বলেছেন যে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই এমন কোনো বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে যার সরাসরি এবং বাস্তব প্রভাব পড়বে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোর ওপর।
সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন এজেন্ট যেভাবে আচরণ করছে তা বিশেষজ্ঞদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক এবং মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর তৈরি কিছু এআই এজেন্ট তাদের নির্ধারিত ডিজিটাল গণ্ডি বা সীমা লঙ্ঘন করে ইন্টারনেটের বিভিন্ন বাহ্যিক ব্যবস্থায় প্রবেশ করে অননুমোদিত প্রবেশের বা হ্যাকিংয়ের চেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি একটি বিশেষ ঘটনায় ওপেনএআই-এর এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে সুচারুভাবে সমন্বয় করে একটি শক্তিশালী দল বা সোয়ার্ম গঠন করেছিল বলে জানা গেছে। যুক্তরাজ্যের এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে অ্যানথ্রপিকের একটি মডেল কোনো একটি ওপেন সোর্স প্রকল্পে ক্ষতিকর কোড প্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছিল এবং মানুষের পরিচয় সফলভাবে নকল করে একজন পর্যালোচককে সেই কোড অনুমোদনের জন্য নানামুখী চাপ প্রয়োগ করেছিল। এসব ঘটনা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য এআই এজেন্টরা যেকোনো ধরনের প্রতারণা, চাপ প্রয়োগ বা কূটকৌশল অবলম্বন করতে পিছপা হচ্ছে না।
এই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্বের এক হাজারের বেশি প্রভাবশালী প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব উন্নত এআই তৈরির গতি কিছুটা কমিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মূল বক্তব্য হলো, মানুষের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত না করে এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন কোনোভাবেই এগিয়ে নেওয়া উচিত নয়। তবে এই পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বজুড়ে চলা প্রবল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব। একদিকে যেমন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিশাল আর্থিক লাভের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা চলছে, অন্যদিকে তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে এআইয়ের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে হিরোশিমার ভয়াবহতা একটি ঐতিহাসিক ট্যাবু বা নিষেধাজ্ঞা তৈরি করতে পেরেছিল এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি হতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। কিন্তু এআই-এর ক্ষেত্রে প্রতিটি কোম্পানি যেন ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলাদা আলাদা ম্যানহাটন প্রকল্প পরিচালনা করছে, যেখানে পিছিয়ে পড়ার কোনো সুযোগ নেই। ফলস্বরূপ, কোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলেও মানবজাতি এক হয়ে এই অতিমানবীয় প্রযুক্তিকে কতটা সামাল দিতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় থেকেই যায়।