
দিনের বেলায় লাখো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকা বিশ্বসেরা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত রাত নামলেই রূপ নেয় এক আতঙ্কের জনপদে। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি অসাধু চক্র দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজার ও পাইপ বসিয়ে সৈকতের তলদেশ ও বালিয়াড়ি থেকে নির্বিচারে বালু লুট করে চলেছে। আর এই অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে তৈরি হচ্ছে গভীর গর্ত ও চোরাবালি, যা অসচেতন পর্যটকদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে সৈকতের এমন গুপ্তখাল ও চোরাবালিতে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ১৩১ জন পর্যটক।
সৈকতের ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জিওটিউব বাঁধের ক্ষেত্রেও চরম অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী বাঁধের জন্য বাইরে থেকে বালু আনার কথা থাকলেও, ঠিকাদাররা বাঁধের মাত্র ১০ থেকে ১৫ ফুট দূর থেকেই মেশিন দিয়ে বালু তুলে তা নির্মাণ করেছেন। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশে গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়ে ঝুঁকি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি কলাতলী পয়েন্টের ভাঙ্গার মোড় এলাকায় এমন অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সময় জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখা অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু মেশিন, পাইপ ও জিওব্যাগ জব্দ করেছে। পর্যটন শাখার ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান সায়েম জানিয়েছেন যে এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত সৈকতকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে সমুদ্র থেকে কোনোভাবেই অবৈধভাবে বালু তুলতে দেওয়া হবে না এবং সৈকতের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ রক্ষায় জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু অভিযান চালিয়ে এই অপরাধ দমন করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত জোরালো নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ ও চোরাবালিযুক্ত স্থানগুলোতে স্থায়ী সতর্কবার্তা টাঙানো এবং সৈকত রক্ষায় কঠোর ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে অমূল্য প্রাণহানির এই সিলসিলা চিরতরে বন্ধ করা যায়।