
প্রতিদিন সকালে অ্যালার্মের কর্কশ ও আকস্মিক শব্দে কেঁপে উঠে ঘুম ভাঙার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকের কাছেই অত্যন্ত চেনা। এটি কেবল সাময়িকভাবে অস্বস্তিকরই নয়, বরং হুট করে রক্তে স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে পুরো স্নায়ুতন্ত্রকে দিনের শুরুতেই মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে—যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যালার্ম অ্যাংজাইটি’ বা অ্যালার্ম আতঙ্ক বলা হয়ে থাকে। মানবদেহের নিজস্ব একটি সুনির্দিষ্ট জৈবিক ঘড়ি বা সারকাডিয়ান রিদম রয়েছে। সঠিক জীবনযাপন এবং নিয়মানুবর্তিতা বজায় থাকলে কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকেত বা অ্যালার্ম ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ঘুম থেকে জেগে ওঠা সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, মানুষের স্বাভাবিক ঘুম নির্দিষ্ট কিছু চক্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে গভীর ঘুম এবং রেম স্লিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যালার্ম যখন হঠাৎ করে কোনো ব্যক্তিকে গভীর ঘুম থেকে জোরপূর্বক জাগিয়ে তোলে, তখন ‘স্লিপ ইনার্শিয়া’ বা তীব্র শারীরিক অবসাদ কাজ করে। অ্যালার্ম ব্যবহারের কারণে আমাদের বেশ কিছু মানসিক ও শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যেমন—অ্যালার্ম বাজার পর ‘স্নুজ’ বোতাম বারবার চাপার অভ্যাস শরীরকে আরেকটি নতুন ঘুমচক্রে প্রবেশ করায়, যা কিছুক্ষণ পরেই আবার ব্যাহত হওয়ায় ক্লান্তি ও মাথা ঘোরানোর সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আকস্মিক উচ্চ শব্দে ঘুম ভাঙলে শরীরে দ্রুত অ্যাড্রেনালিন ও কর্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন নির্গত হয়, যা পুরো দিনটিকে অস্থির ও বিভ্রান্তিকর করে তোলে। অনেকে আবার অ্যালার্ম মিস করার ভয়ে রাতে বারবার জেগে সময় দেখেন, যার ফলে সামগ্রিক ঘুমের গুণমান মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞরা অ্যালার্মের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে ঘুম থেকে ওঠার কিছু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। প্রথমত, ছুটির দিনসহ সপ্তাহের প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে জেগে ওঠার অভ্যাস দেহের ভেতরের ঘড়িকে সঠিক নিয়মে কাজ করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, ঘুম থেকে ওঠার পরপরই প্রাকৃতিক সূর্যের আলো গ্রহণ করা উচিত। ঘরের পর্দা কিছুটা খোলা রাখলে ভোরের আলো প্রাকৃতিকভাবেই মেলাটোনিন হরমোনের ক্ষরণ কমিয়ে শরীরকে চাঙ্গা করে তোলে। তৃতীয়ত, শোবার ঘর সবসময় ঠান্ডা, শান্ত ও অন্ধকার রাখা নিশ্চিত করতে হবে এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে টিভি, মোবাইল বা ল্যাপটপের মতো স্ক্রিন ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এছাড়া রাতের বেলা ভারী খাবার, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ও অ্যালকোহল পরিহার করা এবং ঘুমানোর আগে বই পড়া বা মেডিটেশনের মতো অভ্যাস শরীরকে গভীর বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।