
ভারতের কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে সংঘটিত মর্মান্তিক ও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রাণ হারানো কুষ্টিয়ার প্রথিতযশা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত এবং তার তিন বছরের কচি শিশু পুত্র স্বর্ণশীষ দত্তকে চিরবিদায় জানানো হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার পর কুষ্টিয়ার মিলপাড়ার মহাশ্মশানে বাবা ও ছেলেকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক পরিবেশে পাশাপাশি শায়িত করে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে। জীবনের পথচলায় যিনি ছিলেন সন্তানের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়, মৃত্যুর পরও সেই চিরন্তন বন্ধন যেন অটুট থাকল বাবা ও ছেলের এই পাশাপাশি শায়িত হওয়ার মধ্য দিয়ে।
এর আগে গত শনিবার বিকেলে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে কফিনে মোড়ানো দেবাশীষসহ তার পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। প্রিয় সহকর্মীর নিথর দেহ দেখে বেনাপোল সীমান্তে উপস্থিত সংবাদকর্মীরা আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সন্ধ্যার দিকে মরদেহগুলো বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স কুষ্টিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয় এবং রাতের দিকে কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়ার নিজ বাড়িতে পৌঁছালে সেখানে এক শোকাবহ ও মর্মান্তিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শত শত স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মী শেষবারের মতো তাদের প্রিয় মুখ দেখতে সেখানে ভিড় করেন এবং চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে স্বজনদের কান্নায়।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী হলেও তার সহধর্মিণী আফসানা শারমিন ছিলেন মুসলিম পরিবারের সন্তান। দাম্পত্য জীবনে তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করতেন এবং কেউ ধর্ম পরিবর্তন করেননি। ঠিক সে কারণেই তাদের মৃত্যুর পরও যার যার ধর্মীয় রীতি সম্পূর্ণ যথাযথভাবে বজায় রেখে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। দেবাশীষ ও তার ছেলের শেষকৃত্য শ্মশানে সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি একই ঘটনায় নিহত দেবাশীষের স্ত্রী আফসানা শারমিন ও তার শ্বশুর আকরাম আলীকে কুষ্টিয়া মডেল মসজিদে জানাজা শেষে পৌর গোরস্তানে পাশাপাশি কবরে মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী দাফন করা হয়। দেবাশীষের পরিবারে বেঁচে থাকা একমাত্র সদস্য তার ৭ বছরের মেয়ে মাহিমা ওই সময় দাদা-দাদির কাছে কুষ্টিয়াতেই অবস্থান করছিল।
উল্লেখ্য, পেশাগত জীবনে দেবাশীষ দত্ত কুষ্টিয়ার সাংবাদিক মহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও নির্ভীক মুখ ছিলেন। তিনি কুষ্টিয়া প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দৈনিক আজকের আলোর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং চ্যানেল নাইন ও দৈনিক আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি হিসেবে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন। তার এই আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে কুষ্টিয়ার গোটা সাংবাদিক সমাজে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। সহকর্মীরা জানান, দেবাশীষ কেবল একজন দক্ষ সংবাদকর্মীই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন সবার অত্যন্ত আপন একজন মানুষ, যার শূন্যতা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। গত মঙ্গলবার রাতে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ৯ জনের প্রাণহানির ঘটনায় এই পরিবারের চার সদস্যের মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো দেশবাসীকে কাঁদিয়েছে।