
দিনাজপুর সদর উপজেলার মাসিমপুর সরকারপাড়ার এক সংগ্রামী কিশোরী সাদিয়া আফরিন। অভাবের সংসারে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, সেখানে পড়ালেখার খরচ জোগানো ছিল তার বাবা-মায়ের জন্য এক বিশাল যুদ্ধ। অন্যের লিচুবাগানের ভেতরের সরু পথ পেরিয়ে টিনের ছাপরা ঘরে তাদের বাস। সেই ঘরে পড়ার টেবিল তো দূরের কথা, নিজের মতো পড়ার জায়গা পর্যন্ত ছিল না সাদিয়ার। কখনো বিছানায়, আবার কখনো মায়ের সেলাই মেশিনের ওপর বই রেখে অদম্য জেদে সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। আজ সেই সাদিয়ার নামের পাশে জ্বলজ্বল করছে এসএসসি পরীক্ষায় অর্জিত জিপিএ-৫।
সাদিয়ার এই সাফল্যের গল্পটি সাধারণ কোনো মেধাবীর গল্প নয়, এটি দৃঢ় ইচ্ছা এবং সঠিক দিকনির্দেশনার এক অনন্য নিদর্শন। গত বছর পরিবারের চরম অর্থকষ্টের সময় সাদিয়ার মা আরফা বেগম সাহায্যের আশায় দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলামের কাছে আবেদন করেছিলেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক কেবল আর্থিক সহায়তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি; তিনি সাদিয়াকে ডেকে নিয়ে পড়াশোনার একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন তৈরি করে দেন। তিনি সাদিয়াকে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন বাড়ির কাজ বা পড়া দিয়ে সেটির ওপর পরীক্ষা নিতেন।
শুরুর দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে পড়া দিতে সাদিয়ার ভয় লাগলেও, ধীরে ধীরে সেটি তার অভ্যাসে পরিণত হয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়টি যেন তার জন্য হয়ে ওঠে একটি দ্বিতীয় পাঠশালা। মানুষের নানাবিধ অভিযোগ ও আবেদনের ভিড়ে সাদিয়া তার সপ্তাহের পড়া বুঝে নিত এবং নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাড়ি ফিরত। জেলা প্রশাসক কেবল পড়াশোনায় সীমাবদ্ধ থাকেননি, তিনি সাদিয়াকে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া, ভোরে ওঠা এবং খেলাধুলার পরামর্শ দিয়ে মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন।
সাদিয়ার এই অর্জনে কেবল তার পরিবারই নয়, গর্বিত তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয়রা। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হয়েও কেবল একাগ্রতা এবং জেলা প্রশাসকের স্নেহময় অভিভাবকত্বের কারণে আজ সে সাফল্যের মুখ দেখেছে। বর্তমানে কলেজে ভর্তির প্রস্তুতি নিলেও সাদিয়ার মনে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে অভাবের সংসার নিয়ে। তার স্বপ্ন পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করা এবং পরিবারের হাল ধরা। তবে জেলা প্রশাসকের মতো একজন পথপ্রদর্শকের সান্নিধ্য এবং নিজের কঠোর পরিশ্রম তাকে শিখিয়েছে যে, প্রতিকূল পরিবেশ কখনোই সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না, যদি লক্ষ্য স্থির থাকে।