
বর্ষবর্ষণমুখর দিনে শোকের ছায়ায় ঢেকে গিয়েছিল টালিগঞ্জ। বাংলা চলচ্চিত্রের আঙিনায় আড়ালে থেকে কাজ করা অনন্য এক প্রতিভাবান মানুষ, প্রখ্যাত পরিচালক রাজা সেন আর নেই। দীর্ঘ অসুস্থতার পর এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত রবিবার (১৬ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ৭১ বছর বয়সি এই গুণী পরিচালক। কোমর ও ফুসফুসের জটিলতার পাশাপাশি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভেন্টিলেশনে ছিলেন তিনি। তার প্রয়াণে শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে পুরো টলিপাড়া।
রবিবার দুপুরে রাজার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নন্দনে। সেখানে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী, গৌরব চক্রবর্তী, ঋদ্ধিমা ঘোষ, কৌশিক সেন, রেশমি সেন, অঞ্জনা বসু, সুদেষ্ণা রায়, প্রেমেন্দুবিকাশ চাকীসহ অনেকেই। নন্দন থেকে মরদেহ তাঁর সন্তোষপুরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে শেষযাত্রায় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে পৌঁছায়। শ্মশানে অভিনেত্রী কাঞ্চনা মৈত্র কান্নায় ভেঙে পড়েন। এছাড়া পরিচালক রাজা দাশগুপ্ত, সোনালি চৌধুরী ও অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়সহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত থেকে সন্ধ্যা ৬টার দিকে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। তার মৃত্যুতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, পাওলি দাম, ইন্দ্রাণী হালদার, দেবশঙ্কর হালদার ও পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়সহ শিল্পাঙ্গনের অনেকেই গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন।
৭১ বছরের বর্ণিল জীবনে বড়পর্দা, ছোটপর্দা এবং তথ্যচিত্র নির্মাণে অনন্য সব সৃষ্টি রেখে গেছেন রাজা সেন। একটি তামিল ছবি দিয়ে পরিচালনার খাতা খুললেও ১৯৯৬ সালে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাননের হাতি’ অবলম্বনে নির্মিত তার আলোচিত ছবি ‘দামু’ শ্রেষ্ঠ শিশুচলচ্চিত্র হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। এছাড়া সমরেশ মজুমদারের গল্পে ‘আত্মীয়স্বজন’, প্রফুল্ল রায়ের গল্পে জয়া ও অভিষেক বচ্চনকে নিয়ে তৈরি ‘দেশ’, ঋতুপর্ণাকে নিয়ে ‘দেবীপক্ষ’ এবং জিৎ-স্বস্তিকা জুটির ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ছবির মধ্যে রয়েছে ‘তিনমূর্তি’, ‘ল্যাবরেটরি’, ‘মৌবনে আজ’, ‘কর্নেল’, ‘খাঁচা’, ‘মায়ামৃদঙ্গ’ এবং ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত শেষ ছবি ‘ভালবাসার গল্প’।
বড়পর্দার পাশাপাশি ছোটপর্দায়ও সাহিত্যের নিপুণ রূপকার ছিলেন রাজা সেন। আশাপূর্ণা দেবীর উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘সুবর্ণলতা’ তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এছাড়া ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’, ‘আরোগ্য নিকেতন’, ‘দেশ আমার দেশ’ ও ‘গল্পগুচ্ছ’-এর মতো জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলোও পরিচালনা করেছেন তিনি। তথ্যচিত্র নির্মাণেও তিনি রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর। ১৯৯৩ সালে সুচিত্রা মিত্রকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের জন্য তার প্রথম জাতীয় পুরস্কার অর্জন হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তপন সিংহ, শম্ভু মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং জ্যোতির্ময়ী দেবীর মতো বরেণ্য ব্যক্তিত্বদের নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে তিনি বাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।