
বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়া ৩ লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে ধাপে ধাপে ফিরিয়ে নেওয়ার পূর্ব ঘোষণা দিলেও, বর্তমান বাস্তবতায় এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হতে উল্লেখযোগ্য সময় বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছে মিয়ানমার। রবিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এই বিলম্বের প্রধান ও একমাত্র কারণ হিসেবে রাখাইন প্রদেশে বর্তমানে চলমান তীব্র সংঘাতপূর্ণ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, রাখাইন অঞ্চলের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত ও অনুকূল হওয়ার পরেই কেবল রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা সম্ভব হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কয়েকটি চৌকিতে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার হামলার পর দেশটির সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর নির্বিচার ও ভয়াবহ সামরিক অভিযান শুরু করে। সেই জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতার মুখে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কক্সবাজার ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন শুরু করেন। এর মধ্যে কুতুপালংয়ের মতো বৃহৎ শিবিরগুলোতে বর্তমানে তারা গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। আশ্রিত এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও সসম্মানে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে মিয়ানমার সরকারের কাছে তালিকা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা থেকে মোট ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন রোহিঙ্গার নাম ও বিস্তারিত তথ্য নেইপিদোতে পাঠানো হয়েছে।
বাংলাদেশ কর্তৃক প্রেরিত সেই তালিকার মধ্য থেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করেছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রোহিঙ্গাকে রাখাইন প্রদেশের সাবেক বৈধ বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে বলে স্বীকার করেছে মিয়ানমার। তবে অন্যদিকে রাখাইন প্রদেশে গত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’র রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে। বর্তমানে রাখাইনের রাজধানী সিতওয়ে এবং হাতে গোনা কয়েকটি অঞ্চল ছাড়া বাকি প্রায় পুরো ভূখণ্ডই আরাকান আর্মির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তাদের মূল লক্ষ্য রাখাইনকে একটি স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যে রূপান্তর করা। এই অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও চরম অস্থিতিশীলতার কারণেই মূলত প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।
মিয়ানমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রোববারের বিবৃতিতে আরও জোরালোভাবে দাবি করা হয়েছে যে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণরূপে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়। পাশাপাশি অতীতে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও দুই দেশের সরকার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল বলে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, যদিও সে সময় বাস্তব প্রতিকূলতার কারণে একজন রোহিঙ্গাও স্বভূমে ফিরে যায়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই মানবিক সংকট নিরসনের পথ যে আরও দীর্ঘ হবে, তা মিয়ানমারের এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।