
ভারতের স্বাধীনতা দিবসের পবিত্র ও জাতীয় অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী ‘বন্দেমাতরম’ গান পরিবেশনকে কেন্দ্র করে দেশটির জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ও বাকযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এবারের এই বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী সোনিয়া গান্ধীর একটি ঘটনা। কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে পূর্ণাঙ্গ ‘বন্দেমাতরম’ গানটি পরিবেশন করার সময় সোনিয়া গান্ধী নাকি গানটি থামানোর জন্য ইশারা করেছিলেন—এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। এই বিষয়টিকে হাতিয়ার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে দিয়ে সরাসরি প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলেছে ক্ষমতাসীন দল। তবে বিজেপির আনীত এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে এবং দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করে দিয়েছে কংগ্রেস। দলটির পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে, সোনিয়া গান্ধী কখনই গান থামানোর কোনো ইঙ্গিত দেননি; বরং দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে থেকে ক্লান্ত হয়ে পড়া কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়গের বসার জন্য একটি চেয়ার চেয়ে ইশারা করেছিলেন তিনি, আর সেই স্বাভাবিক বিষয়কেই বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অসৎ উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বিকৃত অর্থে উপস্থাপন করছে।
বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) সেলের প্রধান অমিত মালব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করেন যে, ‘বন্দেমাতরম’ গানটি যখন এর প্রথম কয়েকটি নির্ধারিত স্তবক অতিক্রম করে সামনের দিকে এগোচ্ছিল, তখন সোনিয়া গান্ধীকে রীতিমতো অস্বস্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। তার দাবি, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এমন একটি মহিমান্বিত দেশাত্মবোধক গান চলাকালীন একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রীর এ ধরনের আচরণ অত্যন্ত আপত্তিকর ও তাৎপর্যপূর্ণ। বিজেপির আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এই প্রসঙ্গটি সামনে এনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস টেনে কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয়তাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের যুক্তি হলো, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান ও গানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম, ফলে স্বাধীনতা দিবসের রাষ্ট্রীয় বা দলীয় অনুষ্ঠানে এই গান সম্পূর্ণ গাওয়া নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তি বা তা থামানোর প্রয়াস চালানো অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
অন্যদিকে, বিজেপির এই পুরো আক্রমণকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কাল্পনিক এবং ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে কংগ্রেস। দলটির পক্ষ থেকে প্রধান মুখপাত্র ও অভিজ্ঞ রাজ্যসভা সদস্য জয়রাম রমেশ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে ঐতিহ্যগতভাবেই দীর্ঘদিন ধরে ‘বন্দেমাতরম’-এর প্রথম কয়েকটি স্তবক পরিবেশন করার নিয়ম বা রীতি চলে আসছে। তবে এবারের স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠানে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় সদর দফতরে কোনো কাটছাট না করে বরং পূর্ণাঙ্গ গানটিই শ্রদ্ধাভরে পরিবেশন করা হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন। কংগ্রেস নেতাদের জোরালো বক্তব্য হলো, একটি দীর্ঘ ভিডিওর খণ্ডিত বা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটি বিশেষ দৃশ্যকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের মাঝে বিভ্রান্তি ও ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করছে। সোনিয়া গান্ধীর ওই হাতের ইশারা গান থামানোর জন্য ছিল না, বরং বয়োবৃদ্ধ সভাপতি খড়গজির শারীরিক স্বস্তির কথা ভেবে চেয়ার চাওয়ার একটি সাধারণ অনুরোধ ছিল মাত্র। প্রসঙ্গত, এমন এক সময়ে এই রাজনৈতিক বিতর্কটি প্রকাশ্যে এল যখন ‘বন্দেমাতরম’ রচনার প্রায় দেড়শো বছর পূর্তি এবং ভারতের স্বাধীনতার আশিতম বর্ষ উদ্যাপন ঘিরে দেশজুড়ে জাতীয়তাবাদ ও ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। ফলে স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চে পরিবেশিত এই গানকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই নতুন বিতর্কটি খুব দ্রুতই ভারতের জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।