
চলতি বছরের জুনে মাত্র এক সপ্তাহের তীব্র দাবদাহের কারণে ইউরোপজুড়ে মানুষের মৃত্যুর হার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘ইউরোপিয়ান মর্টালিটি মনিটরিং নেটওয়ার্ক’-এর একটি নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ের তুলনামূলক গড়ের চেয়ে এই তীব্র দাবদাহের ফলে ইউরোপ মহাদেশে অতিরিক্ত প্রায় ১৬,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মর্মান্তিক এই মৃত্যুর সিংহভাগ ঘটনাই ঘটেছে উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে, বিশেষ করে ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং জার্মানিতে। ঐতিহাসিকভাবে নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর দেশ হওয়ায় এসব অঞ্চলের মানুষ ও অবকাঠামো সাধারণত এত উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে পরিচিত বা অভ্যস্ত নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, সমগ্র ইউরোপজুড়ে তাপমাত্রা যখন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন মূলত উত্তর-পশ্চিমের দেশগুলোতে মৃত্যুর হার হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যায়, কারণ তীব্র এই গরম মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত পূর্বপ্রস্তুতি বা পরিকাঠামো তাদের নেই।
উত্তর ইউরোপের এসব দেশের সাধারণ বাসাবাড়িতে এয়ার কন্ডিশনার (AC) ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম থাকায় তা এখন অঞ্চলটির প্রধান রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে, দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলো শতাব্দী ধরে তীব্র উচ্চ তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়ে আসায় গরম মোকাবিলা করার নানা কার্যকরি কৌশল ও সামাজিক অভ্যাস রপ্ত করে নিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, শীতকালে ভাইরাসের কারণে শ্বাসতন্ত্রের রোগ ছড়িয়ে পড়ার ফলে যত মানুষের মৃত্যু হয়, জুনের এই মাত্র এক সপ্তাহের প্রচণ্ড দাবদাহে তার চেয়েও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিজ্ঞানীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, রেকর্ড ভেঙে জুন মাসটি ইতিমধ্যে বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মত প্রভাবে ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন দেখা দিতে পারে।
তীব্র এই তাপপ্রবাহের ফলে ইতোমধ্যেই ইউরোপের বেশ কিছু প্রধান নদ-নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণে নিচে নেমে গেছে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক দাবানল সৃষ্টি হয়েছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই ইউরোপের একটি বড় অংশ পুনরায় নতুন করে আরেকটি তীব্র দাবদাহের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে তাপমাত্রা আবারও ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মাঝামাঝি বা তারও ওপরে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো জরুরি সতর্কবার্তা জারি করেছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর (মেট অফিস) জানিয়েছে যে, তুলনামূলক ঠান্ডা জলবায়ুর উপযোগী করে নির্মিত তাদের জাতীয় অবকাঠামো আবারও একটি মারাত্মক দাবদাহের মুখে পড়তে যাচ্ছে। তাদের শঙ্কা অনুযায়ী, ‘অত্যধিক গরম আবহাওয়ার আরও একটি শক্তিশালী প্রবাহ যুক্তরাজ্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে চলেছে, যেখানে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছিও পৌঁছে যেতে পারে।’ অন্যদিকে, ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা ‘মেতেও-ফ্রান্স’ তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে যে, পুরো সপ্তাহ জুড়ে দেশটির বিভিন্ন অংশে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ঠেকে পুরো দেশজুড়ে তা ছড়িয়ে পড়বে। সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবেই ‘ভবিষ্যতের গ্রীষ্মকালগুলো অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ ও প্রাণঘাতী হবে।’