
সিরিয়ার ১৪ বছরব্যাপী দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন ও গুমের মূল রূপকার হিসেবে পরিচিত সাবেক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আতেফ নাজিবকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে দামেস্কের একটি আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) নাজিবের পাশাপাশি সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পলাতক থাকায় বাশার ও তার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতেই এই রায় ঘোষণা করা হলেও, ৬৬ বছর বয়সি আতেফ নাজিব সশরীরে আদালতে উপস্থিত থেকে বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। দামেস্কের চতুর্থ ক্রিমিনাল কোর্ট ২০১১ সালে দারা প্রদেশে আসাদ সরকারের সংঘটিত অপরাধগুলোকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছে।
কে এই আতেফ নাজিব? ৬৬ বছর বয়সি আতেফ নাজিব হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের আপন খালাতো ভাই। তিনি দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। আশশির দশকের শুরুতে হোমসের মিলিটারি একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন। ২০১১ সালের মার্চে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও আসাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান শুরুর সময়ও তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। তবে আন্দোলন নির্মমভাবে দমনের অভিযোগে ২০১১ সালের এপ্রিলেই আসাদ সরকার তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
নাজিবের শাসনামলেই দারা প্রদেশে একটি স্কুলের দেওয়ালে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি আঁকার অপরাধে বেশ কয়েকজন কিশোরকে গ্রেফতার ও নির্মম নির্যাতন করা হয়। এই ঘটনাই পরবর্তীতে পুরো দেশে আসাদবিরোধী তীব্র আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদ সরকারের পতনের পর নাজিব দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আবার সিরিয়ায় ফিরে আসেন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লাতাকিয়া প্রদেশে অভিযান চালিয়ে সাধারণ নিরাপত্তা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আসাদ অভ্যুত্থানের সূচনালগ্নে সংবেদনশীল পদে থাকার কারণে নাজিবের গ্রেফতারকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছিল।
দামেস্কের চতুর্থ ক্রিমিনাল কোর্টে গত ২৬ এপ্রিল থেকে এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। আটটি শুনানির পর চূড়ান্ত পর্যালোচনা শেষে আদালত এই রায় দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়, নাজিব শিশুসহ বিপুল সংখ্যক বন্দির ওপর সরাসরি নির্যাতন চালিয়েছেন এবং হেফাজতে থাকা অনেক বন্দির মৃত্যুর জন্য তিনি সরাসরি দায়ী। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে আসাদ আমলের কোনো জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সিরিয়ার আদালতের এটিই প্রথম ঐতিহাসিক রায়।
তার বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০১১ সালের বিক্ষোভ চলাকালীন দারা প্রদেশে দমনপীড়নের মূল নির্দেশদাতা হওয়া, হত্যা, নির্যাতন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ। প্রায় ৭৫ জন ভুক্তভোগী ও বাদী নাজিবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন এবং বিচারে নিজেদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন। প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে যাওয়া এই গৃহযুদ্ধের পর সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন বিচার ব্যবস্থার অধীনে আসাদ আমলের অন্যান্য অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে এই রায় একটি বড় পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা