
বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পরও দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর ধরে কোনো দৃশ্যমান অনুসন্ধান বা মামলা দায়ের করেনি দুর্নীতি দমন কমিশন। যদিও সংস্থাটির নিজস্ব এনফোর্সমেন্ট টিম সুনির্দিষ্ট অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অনুসন্ধানের জোরালো সুপারিশ করেছিল, তবুও কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। আলোচিত এই অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছেন দুদকের উপ-পরিচালক আলমগীর হোসেন। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে বন অধিদপ্তরের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার সুফল প্রকল্পসহ বিভিন্ন খাতের অনিয়মের প্রাথমিক নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই শেষে সত্যতা মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিগত ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একটি এনফোর্সমেন্ট দল বন অধিদপ্তরে আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করে। অভিযান শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি কমিশনে দাখিল করা ওই প্রতিবেদনে প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী, উপপ্রধান বন সংরক্ষক এবং সুফল প্রকল্পের পরিচালক গোবিন্দ রায়সহ প্রভাবশালী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে বন অধিদপ্তরের প্রচলিত বদলি ও পদায়ন নীতিমালা ২০০৪ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন করা হতো। রেঞ্জ কর্মকর্তা, স্টেশন কর্মকর্তা এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা পদে পদায়নের জন্য নির্দিষ্ট অঙ্কের ঘুষের রেট নির্ধারিত ছিল। দুদকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বনাঞ্চলের বিভিন্ন রেঞ্জ, স্টেশন ও বিভাগীয় বন বিভাগকে আর্থিক সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হতো এবং সেই শ্রেণি অনুযায়ী ঘুষের পরিমাণও নির্ধারিত থাকত। দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির রেঞ্জ কর্মকর্তা পদে ১৫ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা নেওয়া হতো। এছাড়া এক বছরের জন্য প্রথম শ্রেণির চেকপোস্টে স্টেশন কর্মকর্তা পদে ২০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ১০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ৫ লাখ টাকা আদায়ের তথ্য পাওয়া যায়। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বা ডিএফও পদের ক্ষেত্রে দুই বছরের জন্য প্রথম শ্রেণিতে ৫০ লাখ, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৩০ লাখ এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণের চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে দুদকের নথিতে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের মতো অনিয়মের চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, যা সম্পূর্ণভাবে বিদ্যমান নীতিমালার পরিপন্থী।
শুধু পদায়ন বাণিজ্যই নয়, বরং সরকারের মেগা প্রকল্প সুফল বা টেকসই বন ও জীবিকা প্রকল্পেও ব্যাপক হরিলুটের তথ্য পেয়েছে এনফোর্সমেন্ট টিম। প্রকল্পের আওতায় অনেক এলাকায় বাস্তবে কোনো বনায়ন না করেই সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। কোথাও নামমাত্র চারা রোপণ করা হয়েছে আবার কোথাও কেবল সাইনবোর্ড টাঙিয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। রোপণকৃত চারার কোনো পরিচর্যা না করায় বেশিরভাগ চারা নষ্ট হয়ে গেলেও কাগজে-কলমে ঠিকই বরাদ্দ তুলে নেওয়া হয়েছে। এসব বিষয়ে দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম জানিয়েছেন যে সুফল প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অন্যান্য খাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পরও কেন নিয়মিত অনুসন্ধান বা আইনি পদক্ষেপে এত দীর্ঘসূত্রিতা, সে বিষয়ে দুদকের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি এবং সংস্থার মহাপরিচালক মুহাম্মদ রেজাউল কবীরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম মনে করেন, প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার সাথে সাথে সরাসরি মামলা করার সুযোগ থাকলেও তা দীর্ঘদিন ঝুলিয়ে রাখলে ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যাওয়া বা ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধি মো. মাজেদুল হকও একই মত প্রকাশ করে বলেছেন যে এনফোর্সমেন্ট টিম কোনো অভিযোগ অনুসন্ধানযোগ্য মনে করলে তা দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে কমিশনের জবাবদিহি নিয়ে জনমনে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অন্যদিকে, এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রকাশের আগে বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী এবং প্রকল্প পরিচালক গোবিন্দ রায়ের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।