
দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জাপোরিজিয়া অঞ্চলসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে সুপরিকল্পিতভাবে রাতভর এক ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রুশ বাহিনী। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, এই নির্মম হামলায় প্রাথমিকভাবে অন্তত ছয়জন সাধারণ নাগরিক নিহত এবং আরও অন্তত ১৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের একটি ব্যস্ত শিশু হাসপাতালেও সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্যাট্রিয়টসহ উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চরম ঘাটতিতে থাকা ইউক্রেনের এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পর্যদুস্ত ও অকার্যকর করার উদ্দেশ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া তাদের এই ধরনের সর্বাত্মক বিমান আক্রমণগুলোর মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত মঙ্গলবার ভোরের দিকে অত্যন্ত নিখুঁত ও দূরপাল্লার এসব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে পুরো ইউক্রেনজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জাপোরিজিয়া অঞ্চলের সামরিক প্রশাসনের প্রধান ইভান ফেদোরোভ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, রুশ বাহিনী ওই অঞ্চলটিতে আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যন্ত শক্তিশালী গাইডেড এরিয়াল বোমা ব্যবহার করে এক বিশাল ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালিয়েছে। এই বর্বরোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই ৬ জন নিহত হয়েছেন এবং অন্তত ১৯ জন মানুষ নানাভাবে জখম হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইভান ফেদোরোভের শেয়ার করা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে জাপোরিজিয়ার বেশ কিছু আবাসিক ভবন, বহুতল স্থাপনা এবং রাস্তায় থাকা অসংখ্য যানবাহনে তীব্র আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। এই আকস্মিক হামলার ফলে পুরো এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পুরো শহর অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, রাজধানী কিয়েভে মুহুর্মুহু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ১ জনের আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইউক্রেনের রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবা সংস্থা জানিয়েছে যে, কিয়েভের শেভচেনকিভস্কি জেলার ভেতরে অবস্থিত একটি শিশু হাসপাতালের সুনির্দিষ্ট প্রাঙ্গণে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে এবং এর পাশাপাশি শহরের একটি বড় গুদামেও ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত হাসপাতালের শেল্টারে আগে থেকেই শিশু ও চিকিৎসকরা নিরাপদে অবস্থান করায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পাওয়া গেছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মাইকোলাইভে রাশিয়ার তীব্র ড্রোন হামলায় ৭৫ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা নারী আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সামরিক প্রশাসন নিশ্চিত করেছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে দাবি করেছে যে, তাদের চালিত এই রাতভর সামরিক অভিযানগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল কিয়েভ ও জাপোরিজিয়ার সামরিক-শিল্পভিত্তিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরির কারখানা এবং বিভিন্ন কৌশলগত পরিবহন ও লজিস্টিক সেন্টারগুলো। তবে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ বরাবরই বেসামরিক অবকাঠামো ও সাধারণ মানুষের ওপর এই ধরনের বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ইউক্রেনীয় বাহিনীও বসে থাকেনি; তারা রুশ ভূখণ্ডের গভীরে বহুমুখী ড্রোন হামলা অব্যাহত রেখেছে। রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলের গভর্নর আলেকজান্ডার গুসেভ জানিয়েছেন যে, ইউক্রেনের নিক্ষিপ্ত ড্রোন হামলার কারণে তাদের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ১ জন নিহত ও অন্তত ২ জন আহত হয়েছেন। আকাশপথে ভূপাতিত হওয়া বিস্ফোরকভর্তি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ সরাসরি মাটিতে পড়ে সেখানকার বেশ কিছু গুদাম ও সংরক্ষণাগারে বড় ধরনের আগুন ধরে যায়। যদিও গভর্নর গুসেভ ক্ষতিগ্রস্ত সুনির্দিষ্ট গুদামটির নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি, তবুও রাশিয়ার জনপ্রিয় অনলাইন ভিত্তিক রিটেইলার প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, হামলার ঠিক পরপরই ভোরোনেজে অবস্থিত তাদের প্রধান লজিস্টিক সেন্টার থেকে দ্রুত সমস্ত কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। পরবর্তীতে রাশিয়ার শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ইউনিটগুলো ভোরোনেজ শহর এবং এর আশপাশের অন্তত পাঁচটি জেলা থেকে ইউক্রেনের নিক্ষিপ্ত প্রায় ১৫টি ড্রোন সফলভাবে আকাশে ধ্বংস করার দাবি করেছে। মূলত সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের ভেতরের বিভিন্ন গভীরে অত্যন্ত সফলভাবে আক্রমণ চালানো বৃদ্ধি করার পর থেকেই, এর প্রতিশোধ হিসেবে ইউক্রেনের বিভিন্ন জনবহুল শহরের ওপর রাশিয়ার এই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রবণতা ও তীব্রতা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।