
সিরিয়ায় দীর্ঘ চৌদ্দ বছর ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সময় প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের প্রাণহানির ঘটনার জেরে দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলায় দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তার ছোট ভাই মাহের আল-আসাদকে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট দায়ে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন সিরিয়ার একটি আদালত। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এই একই মামলার রায়ে দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের সাবেক রাজনৈতিক নিরাপত্তা প্রধান আতেফ নাজিবকেও মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মূলত ২০১১ সালে দক্ষিণাঞ্চলীয় দারা প্রদেশে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো নৃশংস সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমন-পীড়নে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ ছিল এই আতেফ নাজিবের বিরুদ্ধে। সেই সময়ের ওই নিষ্ঠুর দমন-পীড়ন ও নির্বিচারে হত্যার ঘটনা থেকেই পরবর্তী সময়ে পুরো দেশজুড়ে এক রক্তক্ষয়ী গণবিদ্রোহ ও সর্বগ্রাসী গৃহযুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।
মঙ্গলবার কঠোর ও নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে আদালতে হাজির করা হয় এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামি আতেফ নাজিবকে। এ সময় তার পরনে ছিল কারাবন্দিদের নির্দিষ্ট পোশাক এবং তাকে আদালতের ভেতরে একটি সুরক্ষিত খাঁচার ভেতরে রাখা হয়েছিল। বিচারক অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর রায় ঘোষণা করেন এবং জনাকীর্ণ আদালতে মৃত্যুদণ্ডের এই ঐতিহাসিক রায় পড়ে শোনান। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দামেস্কে বিজয়ী বেশে প্রবেশ করার ঠিক আগমুহূর্তে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ এবং তার প্রভাবশালী ভাই মাহের আল-আসাদ অত্যন্ত গোপনে সিরিয়া ছেড়ে পালিয়ে রাশিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তারা দুজনেই রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়ে বসবাস করে আসছেন এবং বর্তমান রায় ঘোষণার সময়ও তারা আদালতের বাইরে পলাতক রয়েছেন।
তবে বাশার সরকারের পতনের পর সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একমাত্র আতেফ নাজিবকেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছিল এবং তিনিই বাশার আমলের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রথম যিনি সরাসরি আদালতের কাঠগড়ায় বিচারের মুখোমুখি হলেন। অপরাধের শিকার হওয়া সাধারণ মানুষের পক্ষে এটি একটি বড় ন্যায়বিচারের মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। আতেফ নাজিব সিরিয়ার সেনাবাহিনীর একজন সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ২০১১ সালে বাশার আল-আসাদের লৌহকঠিন শাসনামলে তিনি দেশের সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ সিরিয়ার দারা প্রদেশের রাজনৈতিক নিরাপত্তা শাখার প্রধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে শান্তিপূর্ণ গণতন্ত্রকামী আন্দোলন অত্যন্ত নির্মমভাবে এবং রক্তের মাধ্যমে দমনে তার সরাসরি ভূমিকা ও নৃশংসতার বিষয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছিল।