
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের মাঝে এক ধরণের উদ্বেগ কাজ করছে। এ বছর গড় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৬২.২৫ শতাংশে, যা গত বছরের তুলনায় ৬.২২ শতাংশ কম। শুধু তাই নয়, টানা চার বছর ধরে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমছে। যদিও শিক্ষামন্ত্রী এ এন এম এহসানুল হক মিলন এই ফলাফলকে সমর্থন করে জানিয়েছেন যে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মূল্যায়নের মাধ্যমেই নম্বর দেওয়া হয়েছে। বহু দিন ধরেই বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষার মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদারতার অভিযোগ ছিল, তাই বর্তমান শিক্ষামন্ত্রীর এই যুক্তি পুরোপুরি অমূলক নয়। তবে খাতার নম্বরের এই হিসাবের বাইরেও বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার আরও বড় কিছু বাস্তব চিত্র লুকিয়ে রয়েছে, যা গভীরভাবে উপলব্ধি করা জরুরি।
শিক্ষার্থীদের এই ব্যাচটির পড়াশোনা গত কয়েক বছরে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। ২০২৪ সালের বড় অংশজুড়ে এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক আন্দোলন, সরকার বদল, পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট এবং প্রাকৃতিক বন্যার কারণে বারবার ক্লাসের রুটিন ভেঙে পড়েছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয়েছিল। স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় শিক্ষার্থীরা এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও টিকে থাকার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। স্বাভাবিক একাডেমিক বছরগুলোতে যে ধরনের পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, এই পরীক্ষার্থীরা সেই সুযোগ পায়নি।
শিক্ষামন্ত্রণালয় যদি সঠিক বলে থাকে যে আগের বছরের মতো এবার অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে কঠোর ও সৎ মূল্যায়নে নম্বর দেওয়া হয়েছে, তবে পাসের হার কমে যাওয়াকে কেবল খারাপ খবর হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এর অর্থ হতে পারে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি সুনির্দিষ্ট সংশোধন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ক্লাসরুমের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে ফুলেফেঁপে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বাড়ছিল, তা নিয়ে শিক্ষাবোর্ডগুলোর ওপর বিস্তর সমালোচনা ছিল। ফলাফল অস্বস্তিকর হলেও একটি সৎ এবং কঠোর মূল্যায়ন পদ্ধতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
তবে এই পাসের হার পতনের পেছনে আরও গভীর কিছু সংকট রয়েছে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই ধস নেমেছে যখন শিক্ষাব্যবস্থা এমনিতেই বেশ ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। সংকট তৈরি হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে না এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার মানের মধ্যেও রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। বিশেষ করে দেশের যে ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, সেগুলোকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। প্রতিটি অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠান ইঙ্গিত দেয় যে আমাদের কোথাও না কোথাও বড় ধরনের গলদ রয়েছে। হতে পারে সেখানে দক্ষ শিক্ষকের অভাব রয়েছে, দুর্বল অবকাঠামো রয়েছে কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী যে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার যথাযথ বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদাভাবে মূল্যায়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, শিক্ষা বোর্ডের কড়া নজরদারি এবং যেসব এলাকায় পাসের হার সবচেয়ে বেশি কমেছে সেখানে দ্রুত সরকারি সহায়তা পৌঁছানো জরুরি।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের এই পরীক্ষার ফলাফল পুরো জাতির জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করা উচিত। সংকটের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই পাসের হার কমে যাওয়া প্রমাণ করে যে আমাদের শিক্ষা কাঠামোগুলো কতটা দুর্বল। আগামী দিনে যাতে অন্য কোনো সংকট এসে শিক্ষার্থীদের একটি পুরো শিক্ষাবর্ষ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য একটি টেকসই ও শক্তিশালী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের উচিত বিভিন্ন বোর্ড, জেলা এবং প্রতিষ্ঠানের ওপর এই সংকটের প্রভাব কেমন পড়েছে তা খতিয়ে দেখা এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্দিষ্ট কোনো কর্মপরিকল্পনা আছে কি না তা স্পষ্ট করা। কর্তাব্যক্তিরা এই ফলাফলকে নিছক আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয় না বানিয়ে এটিকে একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজবেন, এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।