
বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব বিলুপ্ত করে এর পরিবর্তে 'স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন' বা এসআরবি নামে পুলিশের অধীনে একটি নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত এই আইনের খসড়া প্রকাশের পরই দেশের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অঙ্গনে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। বিশেষ করে পুরোনো র্যাবের সঙ্গে নতুন এই এসআরবির কাজের ক্ষেত্রে আদতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝেও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে খসড়াটির ওপর মতামত নেওয়া হচ্ছে এবং পরবর্তীতে তা আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের পর জাতীয় সংসদে বিল আকারে পাস হলে তবেই র্যাব বিলুপ্ত হয়ে এসআরবি গঠিত হবে। ২০০৪ সালে বিএনপির শাসনামলে গঠিত র্যাবের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ ছিল। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর থেকেই এই বাহিনীটির বিলুপ্তি চেয়ে আসছে বিভিন্ন সংস্কার কমিটি।
প্রস্তাবিত খসড়া অনুযায়ী, এসআরবি সরাসরি বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। আগের মতো পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদেরও নির্দিষ্ট শর্তে প্রেষণে বা অস্থায়ীভাবে এই ইউনিটে সংযুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা, অস্ত্র-মাদক উদ্ধার, সন্ত্রাস দমন থেকে শুরু করে মানবপাচার ও সাইবার অপরাধ দমনের মতো গুরুদায়িত্ব এই ইউনিটের কাঁধে থাকবে। তবে আগের ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন খসড়ার কিছু কাঠামোগত ও আইনি পার্থক্য রয়েছে।
নতুন খসড়া অনুযায়ী, শুধু গ্রেপ্তার বা অভিযান পরিচালনাই নয়, বরং এসআরবিকে ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট তদন্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এই ইউনিটের নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে খসড়ায় একটি 'অভিযোগ প্রতিকার কমিটি' গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার প্রধান হবেন একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সাধারণ নাগরিকরা এই কমিটির মাধ্যমে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা ক্ষোভ জানাতে পারবেন এবং প্রয়োজনে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান দল গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।
তবে এই পরিবর্তনগুলোকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না মানবাধিকার কর্মীরা। বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক নূর খান লিটন মনে করেন, নতুন এই উদ্যোগটি কেবল পুরোনো র্যাবকে নতুন মোড়কে প্রতিস্থাপন করার শামিল, যেখানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। তার মতে, পুলিশ ও প্রতিরক্ষাবাহিনীর কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও নতুন বাহিনীতেও অন্য বাহিনী থেকে সদস্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এছাড়া মানবাধিকার রক্ষায় সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ বা কুইক রেসপন্স প্রটোকলের বিষয়ে খসড়ায় স্পষ্ট কিছু না থাকায় শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অপরদিকে অপরাধ বিজ্ঞান বিশ্লেষকদের মতে, সদস্যদের জবাবদিহিতা এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।