
ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি চালুর সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে ভারতে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপের সৃষ্টি হয়েছে। এই নীতির প্রতিবাদে আন্দোলন আরও জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছেন দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির (আপ) জাতীয় আহ্বায়ক অরবিন্দ কেজরিওয়াল। আগামী ৪ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে গিয়ে দুই লাখেরও বেশি মানুষের স্বাক্ষরসংবলিত একটি স্মারকলিপি বা আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তিনি। এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে একটি বিশাল মিছিলেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি আয়োজিত এক জাতীয় গণশুনানিতে অরবিন্দ কেজরিওয়াল বলেন, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দিন দিন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ৪ আগস্ট দুপুরে তিনি নিজে প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনে গিয়ে এই আবেদনপত্র পৌঁছে দেবেন। তার সঙ্গে এমন একশ জন সাহসি নেতাকর্মী থাকবেন, যারা যেকোনো পরিস্থিতিতে গ্রেফতার কিংবা পুলিশের লাঠিচার্জের ভয় না পেয়ে এই আন্দোলনে অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছেন।
কেজরিওয়ালের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সরকার যদি নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে এবং ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে দাবি করে, তবে জনসম্মুখে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি খোলামেলা আলোচনার আয়োজন করা উচিত। সেখানে সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই নিজেদের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরতে পারবে। কিন্তু সরকার সেই গণতান্ত্রিক পথে না হেঁটে জনসমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলেও তিনি জোরালো দাবি জানান।
তবে কেজরিওয়ালের এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দিল্লি বিজেপির সভাপতি হর্ষ মালহোত্রা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, ইথানল মিশ্রিত জ্বালানির কারণে গাড়ির ইঞ্জিন নষ্ট হয়েছে বা বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে এমন অন্তত একশটি সুনির্দিষ্ট ঘটনার প্রমাণ কেজরিওয়ালকে জনসমক্ষে দেখাতে হবে। শুধু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুললেই চলবে না।
উল্লেখ্য, ভারতে ধাপে ধাপে পেট্রোলে ইথানলের পরিমাণ বৃদ্ধির এই সরকারি নীতি নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ, এর ফলে অনেক গাড়ির জ্বালানি খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে এবং ইঞ্জিনের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির বড় ধরনের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকার বরাবরই দাবি করে আসছে যে এই নীতি পরিবেশবান্ধব এবং বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর দেশের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে দারুণভাবে সহায়ক।
কেজরিওয়াল আরও বিস্ফোরক অভিযোগ করে বলেছেন যে এই নীতির পেছনে শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক যুক্তি নয়, বরং অন্যান্য স্বার্থও জড়িত রয়েছে। তার দাবি, ইথানল ব্যবসার সঙ্গে কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণমন্ত্রী নীতিন গড়করির দুই ছেলের সম্পৃক্ততা রয়েছে, যা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সমঝোতার কারণেও সরকার দ্রুত এই নীতি বাস্তবায়ন করতে চাইছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বর্তমান আন্দোলনকে আরও যৌক্তিক করতে কেজরিওয়াল তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছেন। প্রথমত, দেশের প্রতিটি পেট্রোলপাম্পে সাধারণ পেট্রোল ও ইথানল মিশ্রিত জ্বালানি উভয় ধরনের জ্বালানিই আলাদাভাবে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে গ্রাহক নিজের পছন্দমতো জ্বালানি বেছে নিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, অবিলম্বে পেট্রোলের বর্ধিত দাম কমাতে হবে। তৃতীয়ত, ইথানলের মূল্যও হ্রাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইথানলের এই ইস্যুটি এখন আর কেবল একটি সাধারণ জ্বালানি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি, মূল্যস্ফীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নিয়েছে। বিরোধী দলগুলো এই ইস্যুকে সামনে রেখেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে জোরালো জনমত গড়ে তোলার কৌশল নিয়েছে।
এদিকে আগামী ৪ আগস্টের এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই দিল্লিতে প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অতীতেও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন অভিমুখে নানা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর বাধা ও আটকের ঘটনা ঘটেছে। এবারও একই ধরনের কঠোর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সরকার ও বিরোধী শিবিরের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলন কতটা জনসমর্থন আদায় করতে পারে, এখন সেদিকেই নজর সবার।