
ভারতে ‘বন্দে মাতরম’-কে আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা এবং এর অবমাননাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণার পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারতীয় মুসলিমদের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড (এআইএমপিএলবি)। বোর্ডের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নাগরিকদের ধর্মীয় স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) বোর্ডের মুখপাত্র ড. সৈয়দ কাসিম রাসূল ইলিয়াস এক বিবৃতিতে বলেন, সংসদের উভয় কক্ষে সংশোধনী বিল পাস করে ‘বন্দে মাতরম’-কে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসকে আইনের মাধ্যমে সব নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ভারতের গণপরিষদ অতীতে দীর্ঘ আলোচনার পরই কেবল ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক গ্রহণ করেছিল, কারণ গানটির পরবর্তী অংশে এমন কিছু ধর্মীয় উপাদান রয়েছে যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।
ড. ইলিয়াস ব্যাখ্যা করেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর কিছু অংশে মাতৃভূমিকে দেবীরূপে বন্দনা করা হয়েছে, যা ইসলামের ‘তাওহিদ’ বা একত্ববাদ আকিদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুসলমানরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে, তাই কোনো সৃষ্টিকে উপাসনার মর্যাদা দেওয়া তাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী। সংবিধানের ১৯ ও ২৫ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেক নাগরিককে মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যার ভিত্তিতে কাউকেই তার বিবেকের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট গান বা স্লোগান দিতে বাধ্য করা যায় না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মুসলমানরা দেশকে ভালোবাসাকে তাদের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব বলে মনে করলেও মাতৃভূমিকে দেবী বা উপাস্য হিসেবে মানতে পারে না। প্রকৃত দেশপ্রেম কোনো স্লোগানে নয়, বরং দেশ ও জনগণের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকারে নিহিত। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো মৌলিক জাতীয় সমস্যাগুলো থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এ ধরনের বিভাজনমূলক ইস্যু তৈরি না করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ‘বন্দে মাতরম’ রচনার ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্প্রতি মোদি সরকার জাতীয় প্রতীক ও সংগীত অবমাননা রোধে ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেছে। গত বুধবার রাজ্যসভায় কণ্ঠভোটে পাস হওয়া এই বিল অনুযায়ী, জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি ‘বন্দে মাতরম’-এর অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। বিলটি এখন লোকসভায় উত্থাপিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।