
কিয়ামতের দিন হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেদিন প্রতিটি মানুষ নিজ নিজ আমলের হিসাব নিকাশের জন্য আল্লাহর সামনে উপস্থিত হবে। সেই সংকটময় মুহূর্তে প্রত্যেক মুমিনের সবচেয়ে বড় চাওয়া ও আশা হবে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করা এবং তাঁর শাফাআত বা সুপারিশ পাওয়া। কিন্তু অগণিত মানুষের ভিড়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কীভাবে তার উম্মতকে চিনবেন—এই প্রশ্নটি প্রতিটি মুমিনের মনেই উঁকি দেয়। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এ বিষয়ে রয়েছে এক অপূর্ব ও সুসংবাদমূলক নির্দেশনা।
ইসলামে ওজু কেবল শারীরিক পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম বা নামাজের পূর্বশর্তই নয়; বরং এটি ইমানদারের পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের এক গভীর প্রতীক। পবিত্র কুরআনের সুরা আল-মায়িদাহর ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ধৌত কর, কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত কর, মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত কর...।’
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, এই ওজুর মাধ্যমেই কিয়ামতের ময়দানে উম্মতকে আলাদাভাবে চিনে নেওয়া সম্ভব হবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতকে কিয়ামতের দিন ওজুর প্রভাবে উজ্জ্বল মুখমণ্ডল ও উজ্জ্বল হাত-পা নিয়ে ডাকা হবে। অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি তার এই উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম, সে যেন তা করে।’ (বুখারি ১৩৬, মুসলিম ২৪৬)। এই হাদিসে ‘গুররান মুহাজ্জালীন’ বা ওজুর অঙ্গসমূহের বিশেষ নূর ও উজ্জ্বলতার কথা বলা হয়েছে, যা কেবল মুমিন বান্দার ওজুর বরকতেই অর্জিত হবে।
হাদিসে আরও উল্লেখ রয়েছে, নবী করিম (সা.) হাউজে কাওসারের ধারে তার উম্মতদের জন্য অপেক্ষা করবেন। তিনি ঘোষণা করেছেন, ‘আমি হাউজে কাওসারের কাছে তোমাদের আগেই উপস্থিত থাকব।’ (বুখারি ৬৫৭৫, মুসলিম ২২৯৬)। হাউজে কাওসারের তীরে এসে যখন উম্মতরা সমবেত হবেন, তখন প্রিয়নবী (সা.) ঠিকই তার উম্মতদের শরীরের ওই নূর ও উজ্জ্বলতা দেখে চিনতে পারবেন এবং নিজ হাতে তাদের পানি পান করাবেন।
এই মহামূল্যবান প্রাপ্তির জন্য মুমিন মুসলমানের কিছু সুনির্দিষ্ট করণীয় রয়েছে। নিয়মিত ও যত্নসহকারে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য ওজু করা, পুরোপুরি সুন্নাহ অনুযায়ী ওজু আদায় করা, সর্বদা পবিত্র থাকার চেষ্টা করা এবং ওজুর মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে পরিবারকে সচেতন করা অত্যন্ত জরুরি। ওজু কেবল বাহ্যিক পবিত্রতা নয়, বরং এটি কিয়ামতের দিন নাজাতের অসিলা। তাই ওজুর প্রতি যত্নবান হয়ে এবং সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমেই কেবল কিয়ামতের সেই মহাসমাবেশে সৌভাগ্যবান উম্মতের কাতারে শামিল হওয়া সম্ভব।