
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাতে নতুন করে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি করে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর নৌ অবরোধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। সোমবার প্রকাশিত এক সর্বাত্মক বিবৃতিতে হুথি নেতৃত্ব জানিয়েছে, সৌদি আরবের বাণিজ্যিক ও সরকারি জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করে এই সামুদ্রিক অবরোধ অবিলম্বে এবং তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা হবে। এই যুগপৎ ঘোষণায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বহুদূর বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান দ্বান্দ্বিক অবস্থাকেই তীব্র করবে না, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে এক বিরাট ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
হুথিদের এই হুমকির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইয়েমেনে সামরিকভাবে সক্রিয় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছে যে, যেকোনো আগ্রাসী পদক্ষেপের শক্ত ও দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে লোহিত সাগরের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী সৌদি পতাকাবাহী ও সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকে হুথিদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছিল যেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মূল ভূখণ্ডের কৌশলগত অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রাখলে লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দেব প্রণালীটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীটি যদি পুরোপুরি বন্ধ বা অবরুদ্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে মোট জ্বালানি তেল সরবরাহ রাতারাতি প্রায় ৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। কারণ, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের তেল পরিবহনের বিশাল অংশ সরাসরি এই সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। এই অবরোধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকস্মিকভাবে কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়, যদিও পরবর্তীতে কূটনৈতিক সমাধানের ক্ষীণ আশার কারণে বাজার সাময়িকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসে। তবে লোহিত সাগরের জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য জাহাজগুলোর পরিচালনা ও বীমা খরচ ইতোমধ্যেই উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে একদিকে যখন হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতি প্রয়োগের কথা বলে সামুদ্রিক অবরোধ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিচ্ছে, ঠিক অন্যদিকে তেহরান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর পাঠানো নতুন কিছু প্রস্তাব এখনো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগ বা পর্দার পেছনের আলোচনা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তা সত্ত্বেও হুথিদের এই নতুন নৌ অবরোধের ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের শান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও দূরে ঠেলে দিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা।