
ফুটবল বিশ্বকাপের জমজমাট ফাইনালে যখন স্পেন ও আর্জেন্টিনা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন খেলার শেষ বাঁশি বাজার পর ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের দৃশ্য দেখে যে কারও মনে হতে পারত যে শিরোপাটি জিতেছে স্বয়ং ইংল্যান্ডই। দেশটির বিভিন্ন পাব, রেস্তোরাঁ, বড় পর্দার সামনে এবং ব্যস্ত শহরের স্কয়ারগুলোতে হাজারো ফুটবলপ্রেমী আনন্দে ফেটে পড়েন। কেউ শূন্যে ওড়াচ্ছেন স্পেনের লাল-হলুদ পতাকা, কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন, আবার কেউ উল্লাসে গেয়ে উঠছেন বিজয়ের গান।
ইংল্যান্ডজুড়ে এই ব্যাপক উল্লাসের নেপথ্যে মূলত কাজ করেছিল সেমিফাইনালের সেই হৃদয়ভাঙা ও বেদনাদায়ক রাত। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ২-১ গোলে হেরে থ্রি লায়ন্সদের ফাইনাল খেলার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। সেই হারের ক্ষত তখনও টাটকা থাকায় ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অধিকাংশ ইংলিশ সমর্থকের সমর্থন স্বাভাবিকভাবেই চলে যায় স্পেনের পক্ষে। লন্ডনের একটি জনপ্রিয় পাবে খেলা উপভোগ করতে আসা ইংলিশ সমর্থক জেমস উইলসন বলছিলেন, ‘ইংল্যান্ডের সেই হারটা আমাদের ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। তাই আজ মন থেকে স্পেনকে সমর্থন করেছি। ওদের ট্রফি জিততে দেখে মনে হচ্ছে, আমাদের কষ্টের কিছুটা হলেও সান্ত্বনা মিলেছে।’ ম্যানচেস্টারের বাসিন্দা অলিভার গ্রিনের মতে, নিজের দল টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেলে এমন একটি দলকে সমর্থন করতে ইচ্ছা করে যারা নান্দনিক ও পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলে। স্পেন ফাইনালে সেটাই প্রমাণ করেছে এবং তারা পুরোপুরি যোগ্য দল হিসেবেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
ইংল্যান্ডের স্থানীয় নাগরিকদের পাশাপাশি এই আবেগ সমানভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও। লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল, ব্রিক লেন, বার্মিংহাম কিংবা ম্যানচেস্টারের প্রাণবন্ত বাংলাদেশি কমিউনিটিগুলোতে দল বেঁধে রাতভর খেলা উপভোগ করেছেন প্রবাসীরা। তাদের একটি বড় অংশও খাস বাংলায় স্পেনের পক্ষেই গলা ফাটিয়েছেন। পূর্ব লন্ডনের ম্যানর পার্কের বাসিন্দা প্রবাসী জাহাংগীর সিকদার বলছিলেন, ‘সেমিফাইনালে আমরা ইংল্যান্ডের জয়ের জন্যই প্রার্থনা করেছিলাম। শেষ মুহূর্তে যেভাবে তারা হেরে গেল, তা আজও আমাদের কষ্ট দেয়। তাই ফাইনালে আমরা স্পেনকেই সমর্থন করেছি। স্পেন ম্যাচ জেতার পর মনে হয়েছে, সেই অবিচার যেন কিছুটা হলেও পুষে গেছে।’ কলেজপড়ুয়া তরুণ সাজিদ তাদের বন্ধুদের উন্মাদনার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা ১৫-২০ জন বাংলাদেশি বন্ধু একসঙ্গে বসে খেলা দেখছিলাম এবং আমাদের প্রায় সবাই ছিল স্পেনের সমর্থক। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই আমরা সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছি, মুহূর্তটি সত্যিই অসাধারণ ছিল।’
ফুটবল কেবল একটি দেশের ভৌগোলিক গণ্ডি বা নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসার মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো এটি পুরনো প্রতিশোধের আবেগ, কখনো খেলার সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধতা, আবার কখনো একটি মর্মান্তিক হারের ক্ষত থেকে জন্ম নেওয়া ক্ষণিকের নতুন সমর্থন। বিশ্বকাপের ফাইনালে আবারও সেই চিরন্তন চিত্রটিই ফুটে উঠল। স্পেনের প্রতিটি সুন্দর আক্রমণে তালি দিয়েছেন এমন হাজারো মানুষ, যাদের সঙ্গে স্পেনের কোনো ধরনের ভৌগোলিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন স্পেনের ফুটবলাররা বিজয়ের উল্লাসে মেতে ওঠেন, ঠিক একই সময়ে লন্ডনের অলিগলি, পাব, স্কয়ার আর বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলোতেও শুরু হয়ে যায় বাঁধভাঙা উদ্যাপন। কেউ ব্যস্ত ছবি তুলতে, কেউ ভিডিও ধারণ করতে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখছেন চ্যাম্পিয়ন স্পেন’। ফুটবল আসলেই অদ্ভুত আবেগের এক খেলা। কখন যে সেই আবেগ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অন্য কোনো দেশের পতাকাকে নিজের করে নেয়, তা কেউ জানে না। ফাইনালে জয় স্পেনের ঘরে গেলেও ইংল্যান্ডের অসংখ্য সাধারণ সমর্থকের মুখে ছিল তৃপ্তির হাসি, আর তাদের সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন হাজারো প্রবাসী বাঙালিও। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এই সোনালি ট্রফি কেবল স্পেনের নয়, যেন ইংল্যান্ডেরই কোনো না পাওয়ার সান্ত্বনা।