
দাঁত ক্ষয় কিংবা হারিয়ে যাওয়ার প্রচলিত চিকিৎসায় ফিলিং, ক্রাউন কিংবা ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টই এখন পর্যন্ত একমাত্র ভরসা। তবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে এই ধারায় আসছে এক বিশাল পরিবর্তন। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এমন এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন, যার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত দাঁত নিজে থেকেই পুনর্গঠিত হতে পারে কিংবা পরীক্ষাগারে (ল্যাবে) তৈরি নতুন জীবন্ত দাঁত মানুষের মুখে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর স্টেম সেল অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিনের গবেষক হ্যানেলে রুওহোলা-বেকার জানিয়েছেন, রিজেনারেটিভ বা পুনর্জননভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির মাধ্যমে কৃত্রিম ফিলিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দাঁতের ক্ষতিগ্রস্ত টিস্যু বা পুরো দাঁত নতুন করে গজিয়ে তোলার প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে। মানবদেহে দাঁতের চিকিৎসায় মানুষ এখন আরও দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাকৃতিক সমাধানের জন্য প্রস্তুত বলে মনে করছেন এই গবেষক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দাঁত কেবল খাবার চিবানোর কাজেই লাগে না, বরং এটি মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাড়ির বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে শুরু করে হৃদরোগ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা এমনকি আলঝেইমার রোগের ঝুঁকি বাড়ার পেছনেও মুখের খারাপ স্বাস্থ্য বা দাঁত হারানোর যোগসূত্র রয়েছে। পাশাপাশি দাঁত হারালে পুষ্টিহীনতা, সামাজিক অস্বস্তি ও মানসিক অবসাদের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে ব্যবহৃত ডেন্টাল ফিলিং সাধারণত ৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং এরপরে বারবার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। এই ঝামেলা এড়াতে গবেষকদের মূল লক্ষ্য এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, যা দাঁতকে নিজেই নিজের ক্ষতি পূরণ করতে সক্ষম করে তুলবে।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের রিজেনারেটিভ ডেন্টিস্ট্রির পরিচালক আনা অ্যাঞ্জেলোভা ভলপোনি জানিয়েছেন, কেবল ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত না করে জৈবিকভাবে ল্যাবে তৈরি বিকল্প দাঁত ব্যবহার করা ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই ও কার্যকর হতে পারে। এই লক্ষ্যে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যে স্টেম সেল ব্যবহার করে দাঁতের শক্ত আবরণ এনামেল ও ডেন্টিন তৈরির কোষ উদ্ভাবন করেছেন। পরীক্ষাগারে এসব বিশেষ কোষ একত্র করে ক্ষুদ্র অঙ্গ বা ‘টুথ অর্গানয়েড’ তৈরি করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক নিয়মে এনামেল তৈরির প্রোটিন নিঃসরণে সক্ষম। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তির হাত ধরেই ‘জীবন্ত ফিলিং’ কিংবা আস্ত নতুন দাঁত মানুষের মুখে বসানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক দল পরীক্ষাগারে পূর্ণাঙ্গ দাঁত তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত এই দাঁতগুলো প্রথাগত ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্টের চেয়ে বহুগুণ কার্যকর হবে, কারণ এতে কৃত্রিম উপাদানের পরিবর্তে প্রাকৃতিক দাঁতের মতো জীবন্ত টিস্যু ও স্নায়ু থাকবে।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এই প্রযুক্তি এখনো গবেষণাগার ও পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা প্রয়োগ শুরু হতে আরও বেশ কিছু বছর সময় লাগবে। তা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীদের এই সফলতা ডেন্টাল সায়েন্সে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা ভবিষ্যতে দাঁত হারানোর প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতিকে পুরোপুরি বদলে দেবে।