
সিলেটের আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী ও অপরাধপ্রবণ সিন্ডিকেট, যা মাজারের পবিত্রতাকে পুঁজি করে কোটি টাকার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলমের অনুসন্ধানী তৎপরতায় এই অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো জনসম্মুখে এসেছে। দানবাক্স থেকে শুরু করে মানতের পশু, স্বর্ণালংকার এমনকি ভক্তদের দেওয়া গিলাফ ও গোলাপজলের বাণিজ্যেও যুক্ত রয়েছে এই চক্রটি।
দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দানবাক্সগুলোর ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ছিল না, যার ফলে দানের বিপুল অর্থ সরাসরি সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যেত। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে যখন দানবাক্স সিলগালা করে সিসিটিভির নজরদারিতে অর্থ গণনা শুরু হয়, তখনই বেরিয়ে আসে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র। মাত্র ২৫ দিনের ব্যবধানে পাওয়া ৬৪ লাখ টাকারও বেশি নগদ অর্থ, ১২ দেশের মুদ্রা ও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার প্রমাণ করে যে বছরের পর বছর এখানে কী পরিমাণ অর্থ লুট হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দানবাক্সে টাকা কম দেখানোর জন্য মাজারের কেরানি ও প্রভাবশালী খাদেমরা রীতিমতো অপকৌশলের আশ্রয় নিতেন, যার মধ্যে মহিলা ইবাদতখানা বন্ধ রাখার মতো ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত।
মাজারে সক্রিয় এই সিন্ডিকেটের অপরাধের পরিধি কেবল অর্থ আত্মসাৎেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, এই চক্রটি মাজারে আসা সাধারণ ভক্তদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কোনো ভক্ত প্রতিবাদ করলে তাকে পকেটমার বা জুতাচোর অপবাদ দিয়ে পুলিশের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া মানতের পশুর ক্ষেত্রেও চলছে চরম অনিয়ম। একটি গরু বা ছাগল বারবার বিক্রির পাশাপাশি জবাইয়ের পর মাংস, চামড়া, ভুঁড়ি ও মাথা সুকৌশলে সরিয়ে ফেলেন বাবুর্চি ও তাদের সহযোগীরা। এই সিন্ডিকেটের আশীর্বাদপুষ্ট পকেটমার ও ছিনতাইকারী চক্র মাজার প্রাঙ্গণে নিয়মিত তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, যার লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পৌঁছায় মূল হোতাদের কাছে।
মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান প্রশাসনিক এই তদারকিকে অনভিপ্রেত বলে অভিহিত করলেও, সাধারণ ভক্ত ও সচেতন মহলে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতিমধ্যে আন-অফিশিয়াল তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে এবং কমিশন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেলে আনুষ্ঠানিক তদন্তের সম্ভাবনা রয়েছে। সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মাজারের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক মাসের মধ্যে সেই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে দীর্ঘদিনের এই অন্ধকার সাম্রাজ্য ভেঙে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।