
ফুটবল একটি নিরবচ্ছিন্ন গতির খেলা, যেখানে ম্যাচের মোমেন্টাম বা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাই জয়ের চাবিকাঠি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে ‘বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন বিরতি’ বা পানি পানের বিরতি নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রচণ্ড গরম থেকে খেলোয়াড়দের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে ফিফা প্রতিটি ম্যাচে প্রথমার্ধের ২২তম এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭তম মিনিটে এই বিরতি নির্ধারণ করেছে। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সুযোগ বলে মনে হলেও, বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। অনেক দলই এই সময়টাকে কৌশল পরিবর্তনের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে, যা বিশেষ করে তুলনামূলক দুর্বল বা আরব দেশগুলোর জন্য আশীর্বাদের চেয়ে অভিশাপ হয়েই বেশি দেখা দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হাইড্রেশন বিরতি এখন আর কেবল পানি পানের সময় নয়, বরং কোচদের জন্য নতুন করে রণকৌশল সাজানোর ‘মিনি টাইম-আউট’-এ পরিণত হয়েছে। শক্তিশালী দলগুলো এই বিরতির পর নিজেদের খেলার ভুলগুলো শুধরে নতুনভাবে মাঠে ফিরে আসছে। এর বড় উদাহরণ কুরাসাও বনাম জার্মানির ম্যাচ। কুরাসাও যখন জার্মানদের রুখে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তখনই হাইড্রেশন বিরতি জার্মানিকে নতুনভাবে গুছিয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয় এবং বিরতির পর তারা দ্রুত গোল করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয়। সৌদি আরব ও উরুগুয়ের ম্যাচেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে বিরতির ঠিক পরেই মোমেন্টাম বদলে উরুগুয়ে ম্যাচে ফিরে আসে। মরক্কো ও ব্রাজিলের ম্যাচেও বিরতিটি ব্রাজিলের জন্য কৌশলগত টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করেছে।
এই বিরতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেলও। তিনি মনে করেন, এটি ফুটবল ম্যাচকে চার ভাগে বিভক্ত করে খেলায় স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচে তার দলের পারফরম্যান্স বিরতির ঠিক পরেই নাটকীয়ভাবে বদলে যায়, যা বিরতির কৌশলগত প্রভাবকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, বিরতির সময় কোচরা যেভাবে খেলোয়াড়দের নতুন নির্দেশনা দেন, তা অনেক ক্ষেত্রে ম্যাচে প্রভাব বিস্তারকারী ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, এই বিরতিগুলো বাণিজ্যিক স্পনসরশিপের সুযোগ তৈরি করায় ফিফাও সমালোচনার মুখে পড়েছে, যদিও ফিফা কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
হাইড্রেশন বিরতির এই প্রথাটি কেবল কৌশলগত পরিবর্তনের সুযোগই দিচ্ছে না, বরং ম্যাচের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনাকেও খণ্ডিত করছে বলে অভিযোগ দর্শকদের। মাঠের খেলায় উত্তেজনার পারদ যখন তুঙ্গে থাকে, তখনই রেফারিকে খেলা থামাতে হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে ভক্তদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে, এই নতুন নিয়মটি ফুটবলের কৌশলগত মানচিত্রে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করলেও, এটি বড় দলগুলোর জন্য বাড়তি সুবিধা এবং ছোট বা অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলগুলোর জন্য স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘায়িত হচ্ছে। পরবর্তী ম্যাচগুলোতে ফিফা এই নিয়ম নিয়ে পুনরায় চিন্তা করবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।