
ইরানের ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেনজি সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বর্তমান অবস্থান আর নিরাপদ নয়। তিনি প্রস্তাব করেছেন, সম্ভাব্য সংঘাত থেকে বাঁচার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এসব ঘাঁটি কাতার, কুয়েত বা বাহরাইন থেকে সরিয়ে ইসরায়েল ও মিশরের মতো নিরাপদ অঞ্চলে স্থানান্তর করা।
একটি অনলাইন ওয়েবিনারে জেনারেল ম্যাকেনজি উল্লেখ করেন, ইরান থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরত্বে কাতারের আল-উদেইদ ঘাঁটিতে সেন্টকমের ফরওয়ার্ড সদর দপ্তর রাখা এখন আর যৌক্তিক নয়। তিনি জানান, ২০২২ সালে যখন তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন, তখনই বাইডেন প্রশাসনকে এই ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তার মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা যেভাবে বেড়েছে, তাতে উপসাগরীয় উপকূলের ঘাঁটিগুলো এখন অত্যন্ত অরক্ষিত। তিনি আরও দাবি করেন যে, তখন তার প্রস্তাবটি বাইডেন প্রশাসন কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক কাঠামোর ভিত্তি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, যেখানে সোভিয়েত আগ্রাসন মোকাবিলাই ছিল মূল লক্ষ্য। পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তান অভিযানের সময়ও সেই পুরোনো কাঠামোই বজায় রাখা হয়। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং ড্রোন প্রযুক্তির উন্নতির কারণে উপসাগরীয় উপকূলের মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ইতিমধ্যে এই ঝুঁকির বাস্তব প্রমাণও পাওয়া গেছে। মিডল ইস্ট আই-এর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হামলার ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি থেকে সরে এসে তাইফ বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি নিয়েছে। এছাড়া উপসাগরীয় উপকূলজুড়ে অবস্থিত আরও কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের হামলায় বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরান কার্যত যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় উপকূল থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক কৌশলের নতুন বিন্যাস এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জেনারেল ম্যাকেনজির প্রস্তাবটি মার্কিন নীতিনির্ধারক মহলে বড় ধরনের আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। একদিকে যেমন ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনা সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির এই পরিবর্তনের বিষয়টি আগামীতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সব মিলিয়ে, স্নায়ুযুদ্ধের সেই পুরোনো কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে নতুন বাস্তবতার নিরিখে যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক বিন্যাস কীভাবে সাজায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।