
নিজস্ব ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে ১৬টি আলাদা নথি জমা দিয়েছিলেন আসামের বাসিন্দা আমিনুল হক। কিন্তু গুয়াহাটি হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানির পর স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এত নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও আবেদনকারী নিজেকে ভারতীয় নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা এবং বিচারপতি শামীমা জাহানের বেঞ্চ এই মামলার রায়ে ১৯৬৪ সালের বিদেশী আইনের ৯ নম্বর ধারাটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছে, যখন নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন তা প্রমাণ করার দায়ভার সম্পূর্ণ আবেদনকারীর ওপরই বর্তায়।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালে, যখন গুয়াহাটির ‘ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল’ আমিনুল হককে ‘বিদেশী’ হিসেবে ঘোষণা করে। সেই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেছিলেন আমিনুল। নিজের দাবির স্বপক্ষে তিনি ১৯৫১ সালের এনআরসি-র অনুলিপি, একাধিক বছরের ভোটার তালিকা, জমি ক্রয়ের দলিল, প্যান কার্ড, ভোটার আইডি এবং একটি স্কুল সার্টিফিকেট জমা দিয়েছিলেন। এমনকি আদালতে তার বাবা সশরীরে উপস্থিত হয়ে আমিনুলকে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেন। তবে আদালত এই মৌখিক সাক্ষ্যকে আইনিভাবে যথেষ্ট বলে মনে করেনি।
হাইকোর্টের রায়ের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নথিপত্র এবং পারিবারিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা। আদালত জানিয়েছে, কেবল কিছু নথি জমা দিলেই নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না, বরং সেই নথিগুলোর মধ্যে যোগসূত্র থাকা জরুরি। রায়ে দেখা গেছে, আবেদনকারীর বাবা ও দাদার নামের বানানে মারাত্মক অসঙ্গতি ছিল। যদিও আদালত নামের বানান নিয়ে কিছুটা ছাড় দিতে রাজি ছিল, কিন্তু আবেদনকারী এটি প্রমাণ করতে পারেননি যে, তাদের পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে একই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। পরিবারের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দার নাম ভোটার তালিকায় একেক সময় একেকভাবে থাকায় আদালত এই তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে স্কুলের সার্টিফিকেটের ক্ষেত্রে। ১৯৯৯ সালে স্কুল ছাড়ার যে সনদটি তিনি জমা দিয়েছিলেন, সেটি তৈরির সঙ্গে জড়িত প্রধান শিক্ষক আদালতে এসে তার সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে সেই নথিটিও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। ভোটার তালিকায় স্থানান্তরের বিষয়টি মৌখিকভাবে দাবি করা হলেও কোনো উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ দিতে পারেননি আবেদনকারী। সবশেষে, ট্রাইব্যুনালের আগের রায়কেই বহাল রেখে আদালত আমিনুল হকের পিটিশনটি খারিজ করে দেয়, যা আসামে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হয়ে রইল।