
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ঐতিহাসিক ডেক সিলগালা করার মাত্র তিন দিনের মাথায় প্রত্যাহার হওয়া ডিসি সারওয়ার আলম বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সচেতন মহলের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। স্বচ্ছতার দোহাই দিয়ে দীর্ঘ ৭০০ বছরের প্রথা ভাঙার পেছনে তার আসল উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক এজেন্ডা: ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে ভেজালবিরোধী অভিযানের মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়া সারওয়ার আলমের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অনুরাগ পোষণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতীতে শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার বন্দনা করে তার বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট এবং আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওপর চালানো অভিযানের তথ্য এখন নতুন করে আলোচনায় আসছে। অনেকে মনে করছেন, মাজারে তার এই নাটকীয় হস্তক্ষেপ ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল বা ‘স্ট্যান্টবাজি’।
আর্থিক স্বচ্ছতা ও অনিয়মের অভিযোগ: মাজারের দানবাক্স সিলগালা করে স্বচ্ছতা আনার দাবি জানালেও, খোদ সারওয়ার আলমের বিরুদ্ধেই গাড়ি ক্রয়ে শর্তভঙ্গ করায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার বেশি জরিমানার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ডিসি অফিসের ‘এলআর ফান্ড’ বা অডিটহীন তহবিলের স্বচ্ছতা নিয়েও জনমনে প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়েছে। মাজারের তহবিলে ব্যক্তিগতভাবে ৫ লাখ টাকা দান করাকেও অনেকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: মাজারের ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীরা এই প্রশাসনিক হস্তক্ষেপকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা হিসেবে দেখছেন। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ব্রাত্য রাইসুসহ অনেকের মতে, সারওয়ার আলমের এই পদক্ষেপটি মাজারের ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা হতে পারে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কেন তিনি এককভাবে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনে’ গেলেন, তা নিয়ে খোদ সরকারের মন্ত্রীরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীও এ বিষয়ে তাড়াহুড়োর বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি: সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের পর সিলেটে তার সমর্থক ও বিরোধীদের মধ্যে মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে এখন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা আগামী এক মাসের মধ্যে একটি যৌক্তিক সমাধান বের করার চেষ্টা করবে। তবে সারওয়ার আলমের এই পুরো অধ্যায়টি সিলেটের মানুষের কাছে একটি রহস্যময় ও বিতর্কিত ঘটনা হিসেবেই থেকে যাবে।