
পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরে (এজেকে) গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গালফ টুডের বরাত দিয়ে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুরো অঞ্চলজুড়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য শাটডাউন বা সম্পূর্ণ অচলাবস্থা জারি করেছে প্রশাসন, যার ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ থমকে গেছে। এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জেরে বর্তমানে পুরো এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।
টানা দুই সপ্তাহের এই সহিংসতায় আন্দোলনকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উভয় পক্ষেরই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিহত ২৪ জনের মধ্যে ৪ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং বাকিরা সাধারণ নাগরিক। এছাড়া সহিংসতা চলাকালে প্রায় শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এবং বিক্ষোভ দমাতে প্রশাসন এখন পর্যন্ত ৫ শতাধিক আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার করেছে।
চলতি বছরের ২৭ জুলাই আজাদ কাশ্মীরের ৪৫ আসনের আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনে ভারত-শাসিত কাশ্মীর থেকে এসে পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই গত ৯ জুন থেকে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয় ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)।
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনকে সরকার ইতোমধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও কড়াকড়ি সত্ত্বেও বিক্ষোভকারীরা আন্দোলন থেকে পিছু হঠেনি। বর্তমানে হাজার হাজার আন্দোলনকারী আঞ্চলিক রাজধানী মুজাফফরাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে রাওয়ালকোট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন。
টানা দুই সপ্তাহের এই নজিরবিহীন অচলাবস্থার কারণে আজাদ কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ এখন চরম খাদ্য ও ওষুধ সংকটে পড়েছেন। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ায় ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং এটিএম বুথগুলো অচল হয়ে পড়েছে। সরকারি নির্দেশে পেট্রোল পাম্প এবং বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম যেমন আকাশচুম্বী হয়েছে, তেমনি বাজারে এর সরবরাহও প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। জীবন রক্ষাকারী জরুরি ওষুধ বা সাধারণ খাবার জোগাড় করতেও স্থানীয় বাসিন্দাদের হন্যে হয়ে ঘুরতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ, যাদের গত কয়েকদিন ধরে কোনো উপার্জন নেই।
আজাদ কাশ্মীরের এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য পাকিস্তানের লাহোরে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) সভাপতি নওয়াজ শরিফ। বৈঠকে তিনি এই সহিংসতায় বেসামরিক নাগরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাণহানিতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
কাশ্মীরের জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে নওয়াজ শরিফ বলেন যে, চলমান এই সহিংস পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি আন্দোলনকারীদের অবরোধ ও ধরনা কর্মসূচি পরিহার করে সরকারের সাথে অর্থপূর্ণ সংলাপে বসার অনুরোধ জানান এবং দেশের জাতীয় সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দেন।