
অস্ট্রেলিয়া জাতীয় ক্রিকেট দলের নতুন অলরাউন্ডার নিখিল চৌধুরীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবে রূপ নিয়েছে. ভারতের পাঞ্জাবে জন্ম নেওয়া এই ক্রিকেটার বাংলাদেশের বিপক্ষে টি২০ সিরিজের প্রথম ম্যাচে (১৭ জুন) অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটিয়েছেন. এর মাধ্যমে বিগত ছয় দশকের মধ্যে প্রথম ভারত-বংশোদ্ভূত পুরুষ ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে খেলার এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তিনি. চট্টগ্রামের একটি হোটেল লবিতে কালো টি-শার্ট এবং গলায় বড় সোনার চেইন পরে থাকা নিখিলকে বর্তমানে আনন্দের সপ্তম স্বর্গে ভাসতে দেখা যাচ্ছে. আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রেখেই নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন এই নতুন অজি তারকা.
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গুরিন্দর সান্ধু এবং তানভীর সংঘের মতো ভারতীয় বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার অতীতে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন. তবে তাঁরা কেউই ভারতে জন্মগ্রহণ করেননি. নিখিলের আগে সর্বশেষ ১৯৬৪ সালে গুজরাটে জন্ম নেওয়া লেগ-স্পিনার রেক্স সেলার্স কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছিলেন. দীর্ঘ ৬২ বছর পর নিখিল চৌধুরী সেই রেকর্ডের পুনরাবৃত্তি করলেন. নারী ক্রিকেটে অবশ্য পুনেতে জন্ম নেওয়া সাবেক অস্ট্রেলীয় অধিনায়ক লিসা স্থালেকার দীর্ঘদিন দলটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন.
বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে সৌম্য সরকারের একটি দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচ লুফে নেওয়ার পর নিখিল বুঝতে পারেন যে, আন্তর্জাতিক স্তরেও তিনি নিজের সেরাটা দিতে পুরোপুরি সক্ষম.
বাংলাদেশ সিরিজের আগে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার চারটি প্রস্তুতি ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হলেও নিখিল প্রাথমিক স্কোয়াডে ছিলেন না. পরবর্তীতে তারকা ব্যাটার ট্রাভিস হেড পরিবারের সাথে সময় কাটাতে ছুটি নিলে নিখিলের ভাগ্য খুলে যায়. ট্রাভিস হেডের ছুটির সময়ে নিখিল বেলজিয়ামে অবস্থান করছিলেন এবং সেখানেই অজি জাতীয় নির্বাচক টনি ডোডেমাইডের কাছ থেকে দলে ডাক পাওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনটি পান, যা তাঁর জীবনের সেরা মুহূর্ত ছিল. তবে ম্যাচের দিন কয়েক ঘণ্টা আগে যখন তিনি জানতে পারেন যে প্রথম একাদশে থাকছেন, তখন কিছুটা উদগ্রীব বা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন. চট্টগ্রামের দর্শকদের কাছ থেকে পাওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং চিৎকার তাঁকে পাঞ্জাবের ঘরোয়া ক্রিকেটে যুবরাজ সিং ও হরভজন সিংদের সাথে খেলার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে.
২০২০ সালে নিখিল তাঁর চাচার সাথে দেখা করতে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে যান এবং করোনা মহামারির কারণে সীমান্ত সিল হয়ে যাওয়ায় আর ভারতে ফিরতে পারেননি. এই আটকে পড়াই তাঁর ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়. ব্রিসবেনের নর্থস ক্লাবে খেলার সময় কোচ জেমস হোপসের নজরে আসেন তিনি এবং তাঁরই সুপারিশে ২০২৩ সালে বিগ ব্যাশ লিগে হোবার্ট হারিকেনসের সাথে চুক্তি করেন. নিয়মানুযায়ী অস্ট্রেলিয়ায় টানা তিন বছর অবস্থানের পর তিনি স্থানীয় ক্রিকেটার হিসেবে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন.
ক্রিকেটের স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে নিখিল অস্ট্রেলিয়ায় কঠোর পরিশ্রম করেছেন. তিনি রেস্তোরাঁয় সবজি কাটার কাজ করেছেন, ট্যাক্সি চালিয়েছেন এবং পার্সেল ডেলিভারির কাজও করেছেন. নিখিল জানান, জীবনের এই কঠিন সময়গুলো তাঁকে মানসিকভাবে শান্ত থাকতে সাহায্য করেছে, যার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ তাঁকে কাবু করতে পারেনি. অস্ট্রেলিয়ার সোজা-সাপটা জীবনযাত্রার সংস্কৃতির সাথে তিনি খুব সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন. বর্তমানে তিনি দলের অভিজ্ঞ স্পিনার অ্যাডাম জাম্পার কাছ থেকে টি২০ ক্রিকেটের বিভিন্ন কৌশল শেখার ওপর সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন.