
১১ জুন ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে হাজার হাজার ভুভুজেলার অবিরাম শব্দের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো আফ্রিকার মাটিতে বসেছিল ফুটবলের বিশ্বআসর। এটি কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না, বরং বহু বছরের উপনিবেশ, বর্ণবৈষম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা আফ্রিকার এক গৌরবময় আত্মপ্রকাশের উৎসব ছিল। কারান্তরীণ দীর্ঘ বছর পেরিয়ে আফ্রিকাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এনে দেওয়া মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা দেখিয়েছিলেন কীভাবে খেলাধুলা একটি জাতিকে এক সুতোয় বাঁধতে পারে। ২০০৬ সালের আয়োজক হওয়ার লড়াইয়ে অল্পের জন্য হেরে গেলেও ২০১০ সালের জন্য নতুন স্টেডিয়াম, আধুনিক বিমানবন্দর ও উন্নত রাস্তাঘাট তৈরি করে বিশ্বকে নিজেদের সক্ষমতার মোক্ষম জবাব দিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর বিপক্ষে সিফিওয়ে শাবালালার গোল পুরো আফ্রিকাকে উল্লাসে ভাসালেও স্বাগতিকরা সেবার দ্বিতীয় পর্বে উঠতে পারেনি, তবে প্রথম আফ্রিকান আয়োজক হিসেবে তারা ইতিহাস গড়ে।
মাঠের লড়াইয়ে সেবার একের পর এক নাটকের জন্ম হয়েছিল। তৎকালীন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল। দিয়েগো ম্যারাডোনার কোচিংয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের হুঙ্কার দিলেও কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে ৪-০ গোলের নির্মম পরাজয়ে ম্যারাডোনার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। অন্যদিকে, টমাস মুলার ও মেসুত ওজিলদের নিয়ে গড়া জার্মানি নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিলেও সেমিফাইনালে স্পেনের ধৈর্যের ফুটবলের কাছে হেরে যায়। ব্রাজিলও কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে বিদায় নেয়। অবশেষে ১১ জুলাই ২০১০ সালে সকার সিটির ফাইনালে মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডস ও স্পেন। ম্যাচের ১১৬ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার করা একমাত্র জাদুকরী গোলে নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে স্পেন। ২০১০ বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বকে শিখিয়েছিল কীভাবে ছোট ছোট পাস (টিকি-টাকা) দিয়ে বিশ্ব জয় করা যায়, আর ভুভুজেলার শব্দের সাথে মিশে থাকা আফ্রিকার সেই আত্মবিশ্বাস আজও ফুটবল ইতিহাসের এক পরম স্মৃতি হয়ে আছে।