
২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম দিককার অন্যতম বৈপ্লবিক ও নৃশংস ঘটনা, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মেধারী শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার মামলায় অভিযুক্ত দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন আদালত। আজ রবিবার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঐতিহাসিক মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। ট্রাইব্যুনালের রায়ে সর্বোচ্চ শাস্তি তথা মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই বিতর্কিত পুলিশ সদস্য হলেন—তৎকালীন পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। একই রায়ে অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অপরাধে মামলার বাকি আসামিদের অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। এই রায়কে জুলাই বিপ্লবের শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি রাষ্ট্রীয় আইনি স্বীকৃতি এবং দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন আইনজ্ঞরা।
বিগত ২০২৪ সালে দেশ কাঁপানো কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই রংপুর খামার মোড় এলাকায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পুলিশের নির্বিচার ও নৃশংস গুলির মুখে দুই হাত ছড়িয়ে বীর দর্পে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিলেন আবু সাঈদ। সেই বুক পেতে দেওয়ার দৃশ্য এবং পরবর্তীতে পুলিশের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের বুলেটে তাঁর লুটিয়ে পড়ার লোমহর্ষক ভিডিওটি মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়লে তা টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় দাবানলের মতো বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়। আবু সাঈদের এই মহিমান্বিত শাহাদাতকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার আন্দোলন এক দফায় তথা স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার দেশজুড়ে কঠোর কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করলেও ছাত্র-জনতার উত্তাল ঢেউ থামাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। অবশেষে এই ঘটনার মাত্র ২০ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সর্বাত্মক ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে। আবু সাঈদ হত্যার এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের মাধ্যমে জুলাই ট্রাইব্যুনালে প্রথম কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে এগোল।