
পৃথিবীর বুকে মক্কার পবিত্র কাবা শরিফ এমন এক অনন্য স্থাপনা, যাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে দুইশ কোটিরও বেশি মুসলমানের গভীর ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক সংযোগ মিশে আছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ এই ঘরের দিকে মুখ করে নামাজে দাঁড়ান এবং তাওয়াফ করেন। তবে কাবাকে ঘিরে মানুষের কৌতূহলের অন্যতম বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো এর ওপর জড়ানো আকর্ষণীয় কালো আবরণ বা ‘কিসওয়াহ’ (الكسوة)। ইসলামের ইতিহাস, আরব সভ্যতা ও মুসলিম সংস্কৃতির দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সঙ্গে এই গিলাফের ইতিহাস ও ঐতিহ্য গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
ইসলামি ইতিহাসবিদদের মতে, কাবাকে কাপড়ে আবৃত করার প্রথা ইসলামের আবির্ভাবেরও বহু শতাব্দী পূর্বে প্রাক-ইসলামি যুগে প্রচলিত ছিল। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল-আজরাকির ‘আখবারু মাক্কাহ’ গ্রন্থের তথ্যমতে, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আবু কারিব আসআদ কাবাকে সম্মান জানিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গিলাফ প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মক্কা বিজয়ের পর কাবার মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পায় এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগ থেকে ইয়েমেনি কাপড় দিয়ে গিলাফ পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকে। ইসলামের শুরুর দিকে সাদা, লাল, হলুদ বা সবুজ রঙের গিলাফ ব্যবহৃত হলেও আব্বাসীয় খিলাফতের যুগে তাদের সরকারি পতাকার রঙের সঙ্গে মিল রেখে কালো রঙের গিলাফ স্থায়ী রূপ পায়।
কাবার গিলাফ নিয়ে কোটি কোটি মুসলমানের আবেগ থাকলেও ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কাবাকে কাপড়ে আবৃত রাখা ইসলামের কোনো ফরজ, ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা বিধান নয়; বরং এটি মূলত কাবার প্রতি সম্মান, সৌন্দর্যবর্ধন এবং আরব ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতা মাত্র। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা কাবাকে ‘আল-বাইতুল হারাম’ বা সম্মানিত ঘর এবং বিশ্ববাসীর হিদায়াতের কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। যুগের পর যুগ ধরে রাজবংশ বা সাম্রাজ্যের পরিবর্তন হলেও কাবার এই কালো গিলাফ আজও মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও চিরন্তন আধ্যাত্মিকতার এক জীবন্ত প্রতীক হয়ে টিকে আছে।