প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 9, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 8, 2026 ইং
ঢামেক মর্গের ৪০ বডির মরচুয়ারি কুলার বিকল, লাশ পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোর শঙ্কায় ময়নাতদন্তে চরম বিপর্যয়

রাজধানীর বুকে দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম চিকিৎসালয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন অ্যান্ড টক্সিকোলজি বিভাগের মর্গে এক নজিরবিহীন ও অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মর্গে থাকা একযোগে ৪০টি মরদেহ সংরক্ষণের ক্ষমতাসম্পন্ন প্রধান মরচুয়ারীকুলার বা ফ্রিজিং সিস্টেমটি হঠাৎ করে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে পড়ায় নতুন লাশ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত আইনি ময়নাতদন্ত কার্যক্রমে গুরুতর জটিলতা ও অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও জরুরি পরিস্থিতিতে মর্গকে পুরোপুরি সচল করতে এবং অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে অচল মরচুয়ারীকুলারটি মেরামতের জন্য হাসপাতালের অধ্যক্ষ বরাবর একটি জরুরি লিখিত আবেদন ও অফিশিয়াল চিঠি পাঠিয়েছে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ। সোমবার সংশ্লিষ্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান স্বাক্ষরিত এই বিশেষ স্মারক ও চিঠির একটি অনুলিপি গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে পৌঁছালে ঢামেক মর্গের ভেতরের এই করুন বাস্তবতার চিত্রটি জনসমক্ষে উন্মোচিত হয়।
অধ্যক্ষ বরাবর পাঠানো সেই অফিশিয়াল স্মারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয় যে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের মর্গের এই ৪০ বডির মরচুয়ারীকুলারটি গত ২ জুন থেকে আকস্মিকভাবে পুরোপুরি অকার্যকর ও অচল হয়ে পড়ে আছে। দীর্ঘ প্রায় এক সপ্তাহের কাছাকাছি সময় ধরে এই অত্যাধুনিক হিমাগারটি অচল থাকায় ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের এলাকা থেকে প্রতিদিন আসা বেওয়ারিশ ও আইনি প্রক্রিয়ার লাশগুলো মর্গে দীর্ঘ সময় ধরে সংরক্ষণ করা এবং সেগুলোর নিয়মিত ময়নাতদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এর ফলে ফরেনসিক বিভাগের দৈনন্দিন দাপ্তরিক ও চিকিৎসা শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে চিঠিতে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান আরও সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান তীব্র গরমের মধ্যে মরচুয়ারীকুলারটি দ্রুত মেরামত করা না হলে লাশ পচে বিকৃত হয়ে যাওয়ার সংকট আরও বহুগুণ বাড়বে, যা আইনি তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিঘ্ন বা আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করবে। তাই বিষয়টিকে ‘অতিব জরুরি’ হিসেবে বিবেচনা করে কলেজের উপাধ্যক্ষ, সচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে এর অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ঢামেক মর্গের ভেতরে ও বাইরে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মর্গ সহকারী ও ডোম কর্মচারীরা অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে জানিয়েছেন যে, গত ২ জুন কুলারটি নষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই তারা মৌখিকভাবে বিষয়টি হাসপাতাল ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর টেকনিক্যাল পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কর্মচারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢামেক মর্গে স্বাভাবিক সময়ে একসঙ্গে প্রায় ৪০টি মরদেহ বৈজ্ঞানিক উপায়ে নিখুঁতভাবে সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সক্ষমতা থাকলেও, মূল বড় কুলারটি নষ্ট থাকায় বর্তমানে জোড়াতালি দিয়ে অন্য ছোট ফ্রিজে মাত্র সাতটি মরদেহ কোনোমতে রাখা যাচ্ছে। এর ফলে মর্গের ভেতরে প্রচণ্ড রকম দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এবং মরদেহ দ্রুত পচে গলে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ ও স্বজনদের কাছ থেকে নতুন কোনো মরদেহ গ্রহণ করা কর্মচারীদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুলারটি দীর্ঘদিন অচল থাকায় নিরুপায় হয়ে মর্গের কর্মচারীরা বাধ্য হয়ে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা রক্তাক্ত ও গলিত মরদেহগুলো মর্গের উন্মুক্ত বারান্দা এবং কক্ষের সাধারণ মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে ফেলে রাখছেন, যা পুরো মর্গ চত্বরে এক অত্যন্ত অস্বস্তিকর, অমানবিক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। বাতাস ভারী হয়ে ওঠা এই তীব্র দুর্গন্ধের কারণে মর্গে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডাক্তার ও কর্মচারীরা প্রতিনিয়ত বমি ও অসুস্থতায় হিমশিম খাচ্ছেন এবং মর্গ সংলগ্ন জনাকীর্ণ প্রধান গলিপথ দিয়ে সাধারণ মানুষের চলাচলও একেবারেই কঠিন হয়ে পড়েছে। এই তীব্র নাগরিক ভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোঃ মাজহারুল শাহীন গণমাধ্যমকে জানান, ফরেনসিক বিভাগের লিখিত আবেদনটি তাঁরা হাতে পেয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে তাঁরা পুরোপুরি অবগত আছেন। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশল বিভাগ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে জরুরি চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং আশা করা যাচ্ছে যে, দু-একদিনের মধ্যেই বিশেষ মেকানিক এনে এই যান্ত্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান করে মর্গকে পুনরায় আগের মতো শতভাগ সচল করা সম্ভব হবে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ঢাকা ফাইলস ২০২৬