প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 9, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 8, 2026 ইং
ঈশ্বরদীতে ছিটকে পড়া শিশুকে বাঁচাতে গিয়ে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী ও শিশুসহ নিহত ২

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নে এক অভাবনীয় ও অত্যন্ত হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ বছরের এক নিষ্পাপ শিশু এবং তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করতে যাওয়া এক মানবিক মোটরসাইকেল আরোহী চলন্ত ট্রাকের নিচে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত কোলইকান্দি বটতলা এলাকায় পাবনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে এই মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক দুর্ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মহাসড়কে একটি চলন্ত মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি যাত্রীবাহী অটোরিকশাকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিলে অটোরিকশায় থাকা এক মায়ের কোল থেকে ছিটকে মহাসড়কের ওপর পড়ে যায় আট বছরের শিশু আলিফ। ওই সময় শিশুটিকে চলন্ত গাড়ির হাত থেকে উদ্ধার করতে ধাক্কা দেওয়া মোটরসাইকেলেরই এক আরোহী অত্যন্ত মানবিকতার সাথে নিজের জীবন বাজি রেখে দৌড়ে আসার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী ঘাতক ট্রাকের নিচে দুজনেই একসঙ্গে চাপা পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যু হয়।
ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে যাওয়া শিশু আলিফ পাবনা সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের কোলাদি গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ হোসেনের ছেলে বলে শনাক্ত করা গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে শিশুটির জীবন বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেওয়া ওই বীর ও পরোপকারী মোটরসাইকেল আরোহীর নাম-পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি এবং পুলিশ তাঁর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছে। পাকশী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নান্নু খান দুর্ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, শিশু আলিফ রোববার বিকেলে তার আপন মা আঁখি খাতুন ও খালার সঙ্গে পাবনা শহর থেকে একটি যাত্রীবাহী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগে পাকশী এলাকায় বেড়াতে এসেছিল। কিন্তু তাদের বহনকারী গাড়িটি পথিমধ্যে কোলইকান্দি বটতলা এলাকায় পৌঁছানোর পর সড়কের পাশে সামান্য কাত হয়ে ভারসাম্য হারালে পেছন থেকে আসা একটি বেপরোয়া মোটরসাইকেল সেটিকে ধাক্কা দেয় এবং মায়ের কোল আলগা হয়ে আলিফ পিচঢালা রাস্তায় ছিটকে পড়ে।
চোখের সামনে নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে মহাসড়কে পড়ে যেতে দেখে তাকে বাঁচাতে মা আঁখি খাতুনও মুহূর্তের মধ্যে চলন্ত অটোরিকশা থেকে লাফ দিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। ওই সময় দুর্ঘটনা ঘটানো মোটরসাইকেলের চালক পরিস্থিতি বেগতিক দেখে নিজের গাড়ি নিয়ে দ্রুত গতিতে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেও, তাঁর পেছনে বসে থাকা আরোহী যুবকটি নিজের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য মহাসড়কের মাঝে দৌড়ে যান। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ঠিক একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ভারী ও দ্রুতগামী ট্রাক তাদের দুজনকে চোখের পলকে পিষ্ট করে দিয়ে চলে যায়, যার ফলে ঘটনাস্থলেই শিশু আলিফ ও ওই অজ্ঞাতনামা যুবকের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এই নির্মম ও আকস্মিক ঘটনাটি চোখের সামনে ঘটতে দেখে আলিফের মা আঁখি খাতুন মানসিকভাবে ভেঙে পড়ার পাশাপাশি শরীরিকভাবেও গুরুতর আহত হন।
মহাসড়কে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পাকশী হাইওয়ে থানা পুলিশ এবং ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে নিহতদের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। তবে দুর্ঘটনার পরপরই ঘাতক ট্রাক ও ক্ষতিগ্রস্ত অটোরিকশাটি নিয়ে তাদের চালকেরা সুকৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। গুরুতর আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মা আঁখি খাতুনকে স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত উদ্ধার করে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। পাকশী হাইওয়ে থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘাতক ট্রাকটি ও তার চালককে শনাক্ত করতে মহাসড়কের আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পালিয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল চালকের বিরুদ্ধেও একটি নিয়মিত মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ঢাকা ফাইলস ২০২৬