প্রিন্ট এর তারিখঃ Jun 9, 2026 ইং || প্রকাশের তারিখঃ Jun 6, 2026 ইং
‘কাশ্মীর কখনোই ভারতের অংশ ছিল না, হবেও না’: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভারতকে সাফ জানাল পাকিস্তান

জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলটি ‘কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না, নয় এবং কোনোদিন হবেও না’ বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সাফ জানিয়ে দিয়েছে পাকিস্তান। বিতর্কিত ও দীর্ঘস্থায়ী এই অঞ্চলটি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে শুরু হওয়া এক তীব্র কূটনৈতিক দ্বন্দ্বে নয়া দিল্লির একতরফা দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এই মন্তব্য করেছে ইসলামাবাদ। জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পার্বথানেনি হরিশ কাশ্মীরকে ভারতের নিজস্ব ও অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করার পর, সাধারণ পরিষদের নিয়ম অনুযায়ী পাকিস্তানের পক্ষে জবাব দেওয়ার অধিকার বা ‘রাইট অব রিপ্লাই’ প্রয়োগ করে এই কড়া পাল্টা জবাব দেন পাকিস্তানি কূটনীতিক গুল কায়সার সারওয়ানি। ১৯৩ সদস্যের এই আন্তর্জাতিক সাধারণ পরিষদকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সারওয়ানি বলেন, ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীর যে একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ অঞ্চল, তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অফিসিয়াল এজেন্ডায় এখনো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে রয়েছে। কোনো ধরনের বিভ্রান্তি বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে এই ঐতিহাসিক, আইনি ও আন্তর্জাতিক চরিত্রকে বদলে দেওয়া যাবে না।
এই কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে যখন জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ নিরাপত্তা পরিষদের বার্ষিক প্রতিবেদন পেশের সময় জম্মু-কাশ্মীর ও ফিলিস্তিন উভয় সংকটেরই ধারাবাহিক প্রাসঙ্গিকতার বিষয়টি তুলে ধরেন। সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত আসিম উল্লেখ করেন, বিগত ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালীন নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিবেদনে ‘ভারত-পাকিস্তান প্রশ্ন’ সংক্রান্ত ২০টিরও বেশি চিঠি বা যোগাযোগ নিরাপত্তা পরিষদের নজরে আনা হয়েছে। তিনি আরও তথ্য দেন যে, ২০২৫ সালের মে মাসে নিরাপত্তা পরিষদ এই কাশ্মীর ইস্যুতে একটি বিশেষ রুদ্ধদ্বার বৈঠকও করেছে, যা প্রমাণ করে এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাত দশকেরও বেশি সময় পরও কাশ্মীর বিরোধটি এখনো নিরাপত্তা পরিষদের গভীর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। পাকিস্তান মনে করে, দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই শান্তি বজায় রাখতে হলে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রস্তাব এবং কাশ্মীরি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী কাশ্মীর বিরোধের একটি ন্যায়সংগত নিষ্পত্তি প্রয়োজন, যেখানে তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।
কাশ্মীর সংকটের পাশাপাশি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শান্তির স্বার্থে ফিলিস্তিনের চলমান ট্র্যাজেডি, বিশেষ করে গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়েও জাতিসংঘের এজেন্ডায় শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে কথা বলেন পাকিস্তানি প্রতিনিধি আসিম আহমেদ। দীর্ঘ রক্তপাত বন্ধে বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর, নিরাপত্তা পরিষদ অবশেষে গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করে ২৮০৩ নম্বর যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, তাকে একটি নতুন আশার আলো হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। পাকিস্তান জোর দিয়ে বলেছে যে, এই ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাবটি পুরোপুরি এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন অপরিহার্য। একই সাথে ১৯৬৭ সালের পূর্বের সীমানার ভিত্তিতে জেরুজালেমকে অর্থাৎ আল-কুদস আল-শরিফকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অখণ্ড ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন এবং ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের প্রতি পাকিস্তানের অবিচল ও ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে ইসলামাবাদ।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং বিশেষ রাজনৈতিক মিশনগুলোর অপরিহার্য ভূমিকার প্রশংসা করে রাষ্ট্রদূত আসিম আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বিশ্বজুড়ে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে এবং এই মিশনগুলো যেন কার্যকর ও পর্যাপ্ত সম্পদসমৃদ্ধ হয়, তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বর্তমান বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলো একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল এবং জবাবদিহিমূলক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে উল্লেখ করে তিনি নিরাপত্তা পরিষদে ‘ভেটো’ ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পাকিস্তানের মতে, নিরাপত্তা পরিষদে একক স্থায়ী সদস্য পদের সম্প্রসারণ এবং ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অভিন্ন লক্ষ্য ও সমতার পরিপন্থি। সব মিলিয়ে জম্মু ও কাশ্মীর এবং ফিলিস্তিনের মতন দীর্ঘস্থায়ী বিরোধগুলোর আইনি ও ঐতিহাসিক ভিত্তি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার তুলে ধরে পাকিস্তান তাদের অবস্থান আরও একবার সুস্পষ্ট করল।
© সকল কিছুর স্বত্বাধিকারঃ ঢাকা ফাইলস ২০২৬