
একই ভবনের এক ফ্ল্যাট থেকে আরেক ফ্ল্যাটের দরজার দূরত্ব মাত্র তিন ফুট হলেও সেই অল্প দূরত্বের মধ্যেও নিজের সন্তানকে নিরাপদ রাখতে না পারার চরম বেদনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হওয়া আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারের বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। তিনি তীব্র আক্ষেপ নিয়ে মনে করেন, বর্তমান সময়ে শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর ভরসা করলেই হবে না; বরং পরিবার, প্রতিবেশী এবং গোটা সমাজকেও অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তিনি তার মনের এই গভীর কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরেন। বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার আয়োজন করেছিল।
অনুষ্ঠানে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এবং ভেঙে পড়া গলায় আব্দুল হান্নান মোল্লা উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চান যে, তার নিষ্পাপ সন্তানের এই করুণ পরিণতির দায়িত্ব আসলে কে নেবে। এটি কি তার নিজের অবহেলা, সমাজের অবহেলা, নাকি রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা, তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাওয়া সোনার টুকরো সন্তানের স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, এই নৃশংসতার জন্য তিনি নিজে দায়ী নাকি অন্য কেউ, তার জবাব সমাজকে দিতে হবে। বৈঠকে হাত জোড় করে সবার কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে পল্লবীর এই দুর্ভাগা বাবা বলেন যে, তিনি সমাজে একজন ধর্ষিতা ও খুন হওয়া সন্তানের বাবা হয়ে বেঁচে থাকতে চান না, বরং একজন গর্বিত পিতা হতে চেয়েছিলেন। তিনি সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে তার সেই হারানো সম্মান ও নাম ফিরিয়ে দেওয়ার আর্তি জানান।
সন্তানহারা এই পিতা আরও বলেন যে, সমাজ যদি তাকে তার সন্তান বা সম্মান ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়, তবে অন্তত এমন একটি নিরাপদ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলুক যেখানে আর কোনো দিন কোনো বাবা-মায়ের বুক এভাবে খালি হবে না। আর কোনো মা-বাবাকে যেন তাদের সন্তানের জন্য সারা জীবন জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে থাকতে না হয় এবং কান্নার পথ বেছে নিতে না হয়। সন্তান যদি সমাজের বুকে এমন পৈশাচিক নৃশংসতার শিকার হয়, তবে তার পুরো দায় শুধু একটি পরিবারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এই নির্মমতার জন্য সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়কেই জবাবদিহির কাঠামোর আওতায় আসতে হবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেন।
পরিশেষে আব্দুল হান্নান মোল্লা তার একমাত্র মেয়ে রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুততম সময়ে সুষ্ঠু বিচার ও আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে এই ধরনের জঘন্য অপরাধের জন্য যে সর্বোচ্চ শাস্তি রয়েছে, আদালত যেন সেটাই প্রদান করে এবং সেই ফাঁসির রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়, সেটাই তিনি নিজের চোখে দেখে যেতে চান। তার এই হৃদয়বিদারক বক্তব্য গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের স্তব্ধ ও আবেগাপ্লুত করে তোলে। সকলেই একমত পোষণ করেন যে, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে আইনি কঠোরতার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধের জাগরণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।