
দেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে এবং এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে হাম এবং এই রোগের বিভিন্ন উপসর্গে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে আরও এক হাজার ৩২ জন শিশু। শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ ও হালনাগাদ হামবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শুরু করে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত এই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় দুই শিশু এবং সিলেট অঞ্চলে এক শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। হঠাৎ করে শিশুদের মধ্যে হামের এই ব্যাপক বিস্তার এবং মৃত্যুর ঘটনা দেশের স্বাস্থ্য খাত ও অভিভাবকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এই রোগের ভয়াবহ রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত আড়াই মাসে কেবল হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েই দেশে ৫২২ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর বাইরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরও ৯১ জন শিশু। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে দেশে হাম ও এর তীব্র উপসর্গে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬১৩ জনে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক সময়ে শিশুদের টিকা না দেওয়া এবং প্রাথমিক উপসর্গগুলোকে অবহেলা করার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করছে এবং মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।
সরকারি এই প্রতিবেদনে দেশের হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় ও চিকিৎসার একটি সামগ্রিক চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোট ৭৭ হাজার ৭৯১ জন শিশুর শরীরে হামের নানাবিধ উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত এই বিপুলসংখ্যক শিশুর মধ্যে পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৬৩ হাজার ১৩৪ জনকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। তবে আশার কথা হলো, যথাযথ চিকিৎসা সেবা ও চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান শেষে এ পর্যন্ত ৫৮ হাজার ৯৬৪ জন শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছে। হাসপাতালগুলোতে এখনও অনেক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে এবং নতুন রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
এছাড়াও, গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বিশেষ নজরদারি ও ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের ৯ হাজার ৬২০ জন শিশুর শরীরে পজিটিভ হিসেবে নিশ্চিতভাবে হাম রোগটি শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়ে জানিয়েছেন, শিশুদের শরীরে তীব্র জ্বর, সর্দি-কাশি ও লালচে র্যাশ দেখা দিলেই দেরি না করে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। একই সাথে সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সব শিশুকে যথাসময়ে হামের প্রতিষেধক টিকা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই মহামারি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন এবং আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।