
রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির স্কুলছাত্রী শিশু রামিসা আক্তারকে (৮) অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা চাঞ্চল্যকর মামলার রায় আগামীকাল রোববার ঘোষণা করা হবে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন বহুল প্রতীক্ষিত এই রায় ঘোষণা করবেন। রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সমস্ত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে উপস্থাপন করে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করতে পেরেছে বলে দাবি করেছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ। শনিবার মামলার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু জানান, ট্রাইব্যুনাল স্বীয় বিবেচনায় আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবেন এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, অন্যদিকে আসামিপক্ষের রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহ কেবল ন্যায়বিচারের আশা প্রকাশ করেছেন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের জন্য ৭ জুন দিন ধার্য করেছিলেন।
মামলার বিবরণ ও অভিযোগ থেকে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকালে সে স্বভাবসুলভভাবে ঘর থেকে বের হলে প্রতিবেশী স্বপ্না আক্তার তাকে কৌশলে নিজের ঘরের ভেতরে ডেকে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে পাঠানোর জন্য তার মা চারদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে সন্দেহবশত আসামিদের ঘরের দরজার সামনে শিশুটির জুতা জোড়া পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। অনেক ডাকাডাকির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্যান্য বাসিন্দারা মিলে জোরপূর্বক দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা রামিসার খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান, যা উপস্থিত সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়।
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে দ্রুত পল্লবী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে স্বপ্না আক্তারকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পরপরই মূল অপরাধী সোহেল রানা পালিয়ে যাওয়ায় পুলিশ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার সামনে থেকে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। এই নৃশংস কাণ্ডের পরদিন ২০ মে রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। একই দিনে প্রধান আসামি সোহেল রানা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় এবং আদালত তার স্ত্রী স্বপ্নাকেও কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত অত্যন্ত দ্রুততার সাথে শেষ করে মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ২৪ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে, যা ট্রাইব্যুনাল একই দিনে আমলে নেয়। এরপর ১ জুন আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় চার্জশিটভুক্ত ১৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জন ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হয়ে নিজেদের সাক্ষ্য প্রদান করেছেন। পুলিশ, রাষ্ট্রপক্ষ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের দ্রুত তৎপরতায় মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হওয়ায় আগামীকালকের রায়ের দিকে তাকিয়ে আছে নিহতের পরিবারসহ পুরো দেশ। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই রায়ের মাধ্যমে অপরাধীদের এমন শাস্তি হবে যা ভবিষ্যতে শিশু সহিংসতার মতো অপরাধ রোধে কঠোর বার্তা দেবে।