আদালত চত্বর কিংবা পুলিশি নিরাপত্তাবলয় ভেদ করে একের পর এক দুর্ধর্ষ আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার একটি হত্যা মামলায় তিন দিনের রিমান্ডে থাকা নারী আসামি মিতু আক্তার পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মহলে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুধু মিতু একা নন, চলতি বছর এ পর্যন্ত আরও সাতজন আসামি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেছে। পুলিশ বিভাগ থেকে এই তথ্যগুলো চেপে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গত চার বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১২ জন আসামি পালিয়েছিল, যা সাম্প্রতিককালের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৩ সালে ৪ জন আসামি পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে যায়। যদিও এর মধ্যে কিছু আসামিকে পুনরায় গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে, তবে সামগ্রিক ঘটনাগুলো পুলিশি নিরাপত্তার বড় দুর্বলতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
কীভাবে এবং কেন পুলিশের এই নিরাপত্তা জাল ছিন্ন করে আসামিরা পালিয়ে যাচ্ছে—তার গভীর বিশ্লেষণ উঠে এসেছে যুগান্তরের অনুসন্ধানে। মূলত আদালতে হাজিরার জন্য জেল থেকে আনা আসামি হস্তান্তর এবং প্রিজনভ্যানে তোলার সময় নিরাপত্তার চরম ফাঁকফোকর থাকে, যা সুযোগ হিসেবে নেয় আসামিরা। এছাড়া আসামিদের চোখে চোখে রাখতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের ঘাটতি, হাতকড়া ও অন্যান্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অবহেলা, অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে আসামি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং দায়িত্বরত সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আসামিদের যোগসাজশ বা আঁতাতের গুরুতর অভিযোগও পাওয়া যায়। পাশাপাশি থানা পুলিশ, আদালত পুলিশ এবং কারা কর্তৃপক্ষের মধ্যকার সমন্বয়হীনতাও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা সাময়িক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলেও পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হেফাজতে থাকা কোনো আসামির পলায়ন কেবল বিচারপ্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং হত্যা বা মাদকের মতো গুরুতর মামলার আসামিরা পালিয়ে যাওয়ায় বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তাও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, পেশাদারিত্ব ও প্রশিক্ষণের ঘাটতির পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আসামিদের যোগসাজশই এই পলায়নের মূল কারণ। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে কেবল দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে সামগ্রিক নিরাপত্তা প্রটোকল নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে নিরাপত্তা ঘাটতি ও দায়িত্ব অবহেলার কারণ চিহ্নিত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
মন্তব্য করুন