ফিলিস্তিনি জনগণের অস্তিত্বের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এক ভয়ংকর ও পদ্ধতিগত নিপীড়নের চিত্র উঠে এসেছে ‘ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ’-এর ১৮৮ পৃষ্ঠার এক নতুন প্রতিবেদনে। ‘এ প্রিডেটরি স্টেট: ইসরাইলি সিস্টেমিক সেক্সুয়ালাইজড অ্যান্ড জেন্ডারড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট প্যালেস্টাইনস’ শিরোনামের এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে যে, কেবল শারীরিক আক্রমণ নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসম্ভব করে তুলতেই দীর্ঘমেয়াদী ‘প্রজনন গণহত্যা’ বা রিপ্রোডাক্টিভ জেনোসাইড চালানো হচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় শুরু হওয়া নিধনযজ্ঞে ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে শিশু এবং নারীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, এই সময়ে ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে এবং আরও ৫ হাজারের বেশি শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ রয়েছে। এছাড়া ১৫ হাজার শিশু হারিয়েছে তাদের জন্মদাত্রী মাকে। আল-নাসর শিশু হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল জায়গায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে নবজাতকদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো এই নিষ্ঠুরতারই প্রতিফলন।
গাজার প্রসূতি ও নারী স্বাস্থ্যসেবার ওপর এই হামলা ছিল পরিকল্পিত। যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রায় ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। চিকিৎসার অভাবে গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্বালানি, অ্যানেসথেসিয়া এবং জীবাণুমুক্ত সরঞ্জামের অভাবে নারী ও নবজাতকদের জীবন প্রতি মুহূর্তে হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের আইভিএফ ক্লিনিক এবং প্রসূতি ওয়ার্ডগুলো ধ্বংস করার মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পরবর্তী প্রজন্মের জন্মদান প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনি মায়েদের অমানবিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। অনেক নারী স্যানিটারি প্যাড বা নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণের অভাবে অসহনীয় কষ্ট ভোগ করছেন। যুদ্ধের চরম পর্যায়ে রানিয়া আবু আনজা বা জোমানা আরাফার মতো শত শত মায়ের গল্প উঠে এসেছে, যারা দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর সন্তান জন্ম দিলেও ইসরাইলি হামলায় তাদের হারাতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিরাপদ মানবিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষিত এলাকায় আশ্রিত থাকা অবস্থাতেও রেহাই পাননি তারা।
ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধিকে ঐতিহাসিকভাবে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে ইসরাইলের একটি অংশ। প্রতিবেদনে নথিবদ্ধ করা হয়েছে যে, দীর্ঘ কয়েক দশক আগে থেকেই ফিলিস্তিনি নারীদের গর্ভধারণকে জাতীয় নিরাপত্তার সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজের মতে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই অপরাধগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি তাদের প্রজননগত অস্তিত্ব বিলীন করার একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা।
এই প্রতিবেদন কেবল যুদ্ধের ভয়াবহতাই তুলে ধরছে না, বরং আধুনিক বিশ্বে মানবিক অধিকার এবং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক চরম সংকটের দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রজনন স্বাস্থ্য এবং প্রসূতি সেবা ধ্বংসের মাধ্যমে একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার এই চিত্র বিশ্ববিবেকের কাছে একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন