ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা পাঁচ বছরের শিশু তাবাচ্ছুম আক্তার তোয়াকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে আদালত মামলার প্রধান আসামি আবু তাহেরকে মৃত্যুদণ্ডসহ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা জরিমানা প্রদান করেছেন। এর পাশাপাশি অন্য একটি ধারায় তাঁকে ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং আরও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সোমবার (২২ জুন) ঝিনাইদহ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. ছালেহুজ্জামান জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ বিবরণ তুলে ধরে বিচারক তাঁর রায়ে এই ঘটনাটিকে একটি জঘন্যতম ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মামলার এজাহার ও বিবরণ থেকে জানা যায়, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাদেডিহি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া মো. নজরুল ইসলাম ও হালিমা খাতুন দম্পতির ছোট মেয়ে তাবাচ্ছুম আক্তার তোয়া গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বাড়ি থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয় [cite: মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বাদেডিহি গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া মোঃ নজরুল ইসলাম ও হালিমা খাতুন দম্পতির পাঁচ বছরের ছোট মেয়ে তাবাচ্ছুম আক্তার তোয়া ২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়।]। অনেক খোঁজাখুঁজির পর, পরের দিন ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে স্থানীয় একটি স্কুলের সেফটি ট্যাংক থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তাবাচ্ছুমের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভিকটিমের বাবা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্তে নেমে একই এলাকার রফিউদ্দিনের ছেলে আবু তাহেরকে আটক করে। পুলিশের জেরার মুখে এবং পরবর্তীতে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আবু তাহের শিশুটিকে ধর্ষণ এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দেয় [cite: সে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধর্ষণসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা বর্ণনা দেয়।]।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জেল্লাল হোসেন মামলাটির নিখুঁত তদন্ত সম্পন্ন করে দ্রুত আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র প্রদান করেন [cite: কালীগঞ্জ থানার ওসি মোঃ জেল্লাল হোসেন মামলাটির তদন্ত করে এবং আদালতে চার্জশীট প্রদান করেন।]। এরপর ৬ জুন ঝিনাইদহ শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট চার্জ গঠন করা হয়। গত ১৭ জুন থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত মাত্র দুই দিনে ডাক্তারসহ মোট ১৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত। ঝিনাইদহের বিচারিক ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো মামলা, যার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পরের দিন অর্থাৎ মাত্র ৫ কর্মদিবসের মধ্যে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে রায় ঘোষণা করা হলো। এই রায়কে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনসহ ব্যাপক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল।
মামলাটিতে একটি নজিরবিহীন বিষয় লক্ষ্য করা গেছে যে, নিহত শিশুর প্রতি সমবেদনা এবং অপরাধের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঝিনাইদহ জেলা আইনজীবী সমিতির কোনো আইনজীবী আসামি আবু তাহেরের পক্ষে লড়তে অংশ নেননি। তবে আইনি নিয়ম বজায় রাখতে আদালত স্বউদ্যোগে একজন ‘স্টেট ডিফেন্স’ বা রাষ্ট্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত আইনজীবী নিয়োগ দেন, যিনি আসামির পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন।
আদালতের এই কাঙ্ক্ষিত রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে শিশু তোয়ার পরিবার কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং অবিলম্বে এই রায় দ্রুত কার্যকর করার জোর দাবি জানান। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মো. আকিদুল ইসলাম এবং পিপি অ্যাডভোকেট এসএম মশিউর রহমান রায়ে পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আশা প্রকাশ করেছেন যে, উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে এবং তা দ্রুত কার্যকর করা হবে [cite: রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মোঃ আকিদুল ইসলাম ও পিপি অ্যাডভোকেট এসএম মশিউর রহমান রায়ের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেছেন, আদালতের রায় দ্রুত কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করছি।]।
মন্তব্য করুন