রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ভূকম্পনজনিত কর্মকাণ্ডের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণত ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল অনেক দূরে বা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে হলেও, বর্তমানে ঢাকার মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে উৎপত্তিস্থলসহ একাধিক ভূমিকম্পের ঘটনা ভূতাত্ত্বিকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ২২শে জুন অনুভূত ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি রাজধানীর বাসিন্দাদের মনে যে ভয়ের উদ্রেক করেছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভূ-প্রকৃতির এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে আঘাত হানা ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি ছিল গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী কম্পন। ওই ঘটনার পর একই এলাকায় পরপর তিনটি আফটারশক বা ছোট ছোট কম্পন অনুভূত হওয়া প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মাটির নিচে থাকা প্লেট বা চ্যুতিগুলো (faults) বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের ১লা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরের ভূমিকম্পসহ সাম্প্রতিক এই ছোট ও মাঝারি মাত্রার কম্পনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ শক্তির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
এই ঘনঘন কম্পনগুলো মূলত স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে, যেখানে ভূ-ত্বকের ভেতরের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা চলে। তবে ভূ-তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি ভিন্ন বার্তাও দিতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ছোট কম্পনগুলো অনেক সময় কোনো বড় ধরনের ভূমিকম্পের ‘ফোরশক’ বা পূর্বসূরি হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে মাটির নিচে জমে থাকা প্রবল শক্তির চাপ যখন চ্যুতিরেখা বরাবর বের হওয়ার পথ পায়, তখন ছোট ছোট কম্পনের মাধ্যমে তা জানান দেয়। যদিও ছোট মাত্রার ভূমিকম্প সরাসরি বড় বিপদের নিশ্চয়তা দেয় না, কিন্তু ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরীর জন্য এটি অবশ্যই সতর্কবার্তা।
ঢাকাকে ঘিরে থাকা ফল্ট লাইনগুলো বা চ্যুতিগুলো কতটুকু সক্রিয়, তা নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার অভাব রয়েছে। তবে রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যেভাবে ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দুগুলো সরে আসছে, তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূকম্পন হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয় না। তাই নগরায়নের ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড মানা, নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া আয়োজন করা এবং ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ আরও জোরালো করা এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতির এই বার্তাকে হেলায় না নিয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও সচেতনতা বাড়ানোই হবে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।
মন্তব্য করুন