দিনভর তীব্র কূটনৈতিক ও সীমান্ত উত্তেজনা এবং দীর্ঘ দুই দিনের চরম অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখা (জিরো লাইন) থেকে আটকে পড়া ১১ জন নাগরিককে ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের অবৈধ পুশইনের শিকার হয়ে ফেরত যাওয়া এই দলটির মধ্যে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ, চারজন নারী এবং চারটি কোমলমতি শিশু রয়েছে, যাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন। আজ সোমবার সকাল ৮টার দিকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান। বিজিবির এই তাত্ক্ষণিক বিবৃতির পর গত দুই দিন ধরে সীমান্তে চলমান এক ধরনের যুদ্ধংদেহী ও থমথমে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবসান ঘটেছে।
বিজিবি গোয়েন্দা শাখা ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সীমান্তবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে মশালগাঁও সীমান্ত এলাকার কাঁটাতারের ওপার দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ওই ১১ জন বাংলাভাষী নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশে পুশইন করার বা ঠেলে দেওয়ার একটি গভীর অপচেষ্টা চালায় বিএসএফ জওয়ানরা। তবে সীমান্তে নিয়োজিত বিজিবির কড়া ও অভেদ্য পাহারার কারণে এবং টহল দলের কঠোর প্রতিরোধে বিএসএফের সেই অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয় এবং তারা কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করাতে পারেনি। এই ব্যর্থ পুশইনের পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশের মধ্যবর্তী সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে তীব্র রোদ ও বৃষ্টিতে চরম মানবেতর ও অবর্ণনীয় দিন কাটছিল ওই নিরীহ পরিবারটির। বিশেষ করে দলটিতে নিষ্পাপ শিশু এবং একজন অন্তঃসত্ত্বা নারী থাকায় স্থানীয় মশালগাঁও গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র মানবিক উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে, যা পরবর্তীতে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে তীব্র উত্তেজনার রূপ নেয়।
সীমান্তের জিরো লাইনে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটার পর থেকেই বিজিবির ৪২ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা জিরো লাইনে ওই পরিবারটির অবস্থান ও বিএসএফের গতিবিধি অত্যন্ত কঠোরভাবে এবং দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। একই সাথে বিএসএফের যেকোনো ধরনের আকস্মিক হামলা বা নতুন করে অবৈধ অনুপ্রবেশের চেষ্টা রুখে দিতে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরের সবকটি গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্টে অতিরিক্ত বিজিবি সদস্য মোতায়েনসহ টহল কার্যক্রম বহুগুণ জোরদার করা হয়। বিজিবি সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের এই আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ লিপি পাঠানো হয় এবং এর পাশাপাশি বিজিবির অনড় অবস্থান ও কড়া প্রতিবাদের মুখে রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার পর বিএসএফ শূন্যরেখায় অবস্থানরত ওই ১১ জনকে সুকৌশলে পুনরায় ভারতের অভ্যন্তরে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান আজ সকালে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে জানান, বিএসএফের বিশেষ টিম জিরো লাইনে আটকে থাকা ওই ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে তাদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে জিরো লাইনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। বর্তমানে সীমান্তের কোনো পয়েন্টের শূন্যরেখায় কোনো বহিরাগত বা ভারতীয় নাগরিক অবস্থান করছে না। তবে এই পুশইনের ঘটনার পর সীমান্ত দিয়ে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি, চোরাচালান, সীমান্ত অপরাধ ও অবৈধ অনুপ্রবেশের যেকোনো অপচেষ্টা শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বিজিবির নিয়মিত টহল, নজরদারি ও গোয়েন্দা কার্যক্রম আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি জোরদার করা হয়েছে।