মধ্যপ্রাচ্যের দুই পরমাণু ও সামরিক পরাশক্তি ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাত এক অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দামামা বাজতে শুরু করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র মনে করছে যে, ইরানের সামরিক ও কৌশলগত বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে তাদের সাম্প্রতিক বিমান হামলা বা অপারেশন আরও বেশ কিছুদিন ধরে চলতে পারে। এই সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সামরিক অভিযানের কথা মাথায় রেখে এবং যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এবার বড় পরিসরে তাদের রিজার্ভ সেনা বা সদস্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েনের এক ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। কাতারভিত্তিক প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’ ইসরাইলি আর্মি রেডিওর গোপন ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাত দিয়ে সোমবার এক বিশেষ জরুরি প্রতিবেদনে এই সামরিক প্রস্তুতির সংবেদনশীল তথ্যটি বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছে।
ইসরাইলি আর্মি রেডিওর প্রধান প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদক দোরন কাদোশ এই সামরিক প্রস্তুতির গভীরতা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন যে, তেল আবিবের সামরিক কমান্ড এই মুহূর্তে ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ জোরদার করতে একাধিক বিশেষ রিজার্ভ ব্যাটালিয়নকে সম্পূর্ণ সক্রিয় করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইতিমধ্যে তেল আবিব ও আশেপাশের সেনা ছাউনিগুলোতে রিজার্ভ ব্যাটালিয়নের সদস্যদের জরুরি তলব করার প্রশাসনিক ও লজিস্টিক প্রস্তুতি অত্যন্ত জোরালোভাবে শুরু হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার যে নজিরবিহীন ও চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের (IDF) এই আকস্মিক ও বিশাল সেনা সমাবেশের পদক্ষেপটিকে আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং একটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে মনে করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই নজিরবিহীন উত্তেজনার সূত্রপাত হয়েছিল গত রোববার, যখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যুদ্ধবিরতির সব শর্ত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের জনবহুল আবাসিক এলাকায় একযোগে ব্যাপক ও বর্বরোচ্ছেদ বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি ফাইটার জেট। লেবাননের মাটিতে চালানো ওই নৃশংস হামলার তীব্র ও তাৎক্ষণিক কড়া জবাব দিতে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) রোববার রাতেই ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত ও প্রধান প্রধান শহরগুলো লক্ষ্য করে একযোগে ঝাঁকে ঝাঁকে দূরপাল্লার মিসাইল বা ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। রোববার রাতে ইসরাইলের মাটিতে ওই সফল ও শক্তিশালী হামলার পর আইআরজিসির পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছিল যে, তারা ইসরাইল কর্তৃক আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘন করাকে আর কোনোভাবেই সহ্য করবে না এবং এর প্রতিশোধ হিসেবেই এই মিসাইল অপারেশন পরিচালনা করা হয়েছে।
ইরানের এই বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আজ সোমবার সকালে নতুন করে এক বিশাল ও পালটা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী, যার কারণে দুই দেশের সংঘাত এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ইসরাইলি যুদ্ধবিমানের বোমাবর্ষণের পর আজ সোমবার ভোর থেকে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত সামরিক শহরে শক্তিশালী ও বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে বিভিন্ন বৈশ্বিক কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে একের পর এক এই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান হামলার তীব্রতার মধ্যেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো পক্ষেই সুনির্দিষ্ট কী পরিমাণ জানমালের ক্ষতি হয়েছে কিংবা কোনো সাধারণ বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল যেভাবে তড়িঘড়ি করে তাদের রিজার্ভ সৈন্যদের মূল রণক্ষেত্রে ডেকে আনছে, তা প্রমাণ করে তারা কেবল আত্মরক্ষা নয়, বরং ইরানের ভেতরে আরও বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আগ্রাসন চালানোর সুদূরপ্রসারী নীল নকশা তৈরি করেছে।