দেশের ব্যাংকিং খাতের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর একটি দুর্নীতির মামলায় অবশেষে সর্বোচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন লাভ করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। সোমবার দেশের সর্বোচ্চ বিচারিক আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ দীর্ঘ আইনি শুনানি শেষে তাঁর এই জামিন আবেদন মঞ্জুর করে আনুষ্ঠানিক আদেশ প্রদান করেন। আদালতের এই যুগান্তকারী ও চূড়ান্ত আদেশের ফলে দীর্ঘ দিন কারাভোগের পর ড. আবুল বারকাতের কারামুক্তির ক্ষেত্রে আর কোনো ধরনের আইনি বা সাংবিধানিক বাধা থাকছে না বলে তাঁর প্যানেল আইনজীবীরা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। তবে জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ একটি বিশেষ শর্ত জুড়ে দিয়ে ড. বারকাতের ব্যক্তিগত আন্তর্জাতিক পাসপোর্টটি আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় অবিলম্বে জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেছেন, যাতে তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগ করতে না পারেন।
অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত দেশের অর্থনীতি অঙ্গনের এক অত্যন্ত পরিচিত ও হেভিওয়েট ব্যক্তিত্ব, যিনি দীর্ঘ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি হিসেবেও দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে তাঁকে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে প্রভাবশালী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তবে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে তাঁর মেয়াদে ব্যাংকটিতে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাতের বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসে, যা দেশের আর্থিক খাতে এক বিশাল বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা আইনি তদন্তের আওতায় আসে।
মূলত, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে এননটেক্স গ্রুপের নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল পরিমাণ ঋণ বরাদ্দ দিয়ে ব্যাংকটির রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে মোট ২৯৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগে ড. আবুল বারকাতের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি আবুল বারকাতসহ দেশের মোট ২৩ জন প্রভাবশালী কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় এই অর্থ আত্মসাতের মামলাটি দায়ের করেছিল। মামলা দায়েরের পর দীর্ঘ দিন আত্মগোপনে থাকার পর, একই বছরের ১০ জুলাই রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকার একটি গোপন আস্তানা থেকে দুদকের বিশেষ একটি দল সুনির্দিষ্ট অভিযানের মাধ্যমে তাঁকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর থেকেই তিনি আদালতের নির্দেশে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘ দিন ধরে বন্দি অবস্থায় দিনাতিপাত করছিলেন।
আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে জানা গেছে, আজ আপিল বিভাগে ড. বারকাতের জামিন আবেদনের পক্ষে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং তাঁর বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে জামিনের আর্জি জানান। অন্যদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে এই জামিনের তীব্র বিরোধিতা করা হলেও আদালত শর্তসাপেক্ষে জামিন মঞ্জুরের সিদ্ধান্ত নেন। ড. আবুল বারকাতের এই সুদীর্ঘ আইনি লড়াই ও শর্তসাপেক্ষে জামিন পাওয়ার ঘটনাটি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। কারাগারের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া ও জামিনের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আজ বিকেলের মধ্যেই ড. আবুল বারকাত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তি পেতে পারেন বলে কারা কর্তৃপক্ষ আভাস দিয়েছে।