জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে শেরপুর সদর হাসপাতালে যথাযথ ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবার তীব্র সংকট রয়েছে বলে অত্যন্ত জোরালো অভিযোগ তুলেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা। রোববার জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ৭১ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের মাধ্যমে সরাসরি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি এক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সংসদে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এই নারী সংসদ সদস্য বলেন, দেশের যে জনাকীর্ণ হাসপাতালের সাধারণ মানুষকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করার কথা ছিল, চরম অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতার কারণে সেই সরকারি হাসপাতালটি আজ নিজেই কার্যত আইসিইউতে চলে গেছে। শেরপুর জেলার প্রায় ১৭ লাখ সাধারণ মানুষের একমাত্র চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল এই সদর হাসপাতালের বর্তমান বাস্তব ও করুণ চিত্র তুলে ধরে মহান জাতীয় সংসদের স্পিকারের মাধ্যমে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।
সংসদ সদস্য সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা শেরপুর সদর উপজেলার চরাঞ্চলের অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই অঞ্চলের অধিকাংশ গ্রামীণ রাস্তাই বর্তমানে কাঁচা ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সেই দুর্গম ও ভাঙাচোরা পথ দীর্ঘ সময় ধরে পাড়ি দিয়ে যখন একজন গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি, একজন মুমূর্ষু রোগী কিংবা কোনো গর্ভবতী মা জীবন বাঁচানোর শেষ আশায় শেরপুর সদর হাসপাতালে ছুটে আসেন, তখন তাঁদের ভাগ্যে হাসপাতালের কোনো সিট বা বেড জোটে না। বেড না পেয়ে নিরুপায় হয়ে হাসপাতালের নোংরা মেঝে, খোলা বারান্দা কিংবা করিডোরে দিনের পর দিন রোগীদের যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকার এই নির্মম দৃশ্যটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক এবং অমানবিক। তিনি জানান, ১৭ লাখ মানুষের এই হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ সিনিয়র কনসাল্ট্যান্টের ১০টি পদের সবকটিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে, যার ফলে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে আসা প্রায় ৭০০ রোগীর বিশাল চাপ সামলাতে সেখানে কর্মরত সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত ও লজিস্টিক সংকটের তীব্র সমালোচনা করে সানসিলা জেবরিন বলেন, সদর হাসপাতালে সরকারি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স সচল রয়েছে কিন্তু তা চালানোর জন্য কোনো চালক বা ড্রাইভারের পদায়ন নেই। বহুতল ৯তলা ভবন নির্মাণ করা হলেও সেখানে রোগীদের ওঠানামার জন্য পর্যাপ্ত ও সচল লিফ্টের কোনো সুব্যবস্থা নেই। তিনি আরও তথ্য দিয়ে জানান, ভয়াবহ করোনাকালীন সময়ে শেরপুর সদর হাসপাতালে সরকারি প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক আইসিইউ (ICU) ও সিসিইউ (CCU) ইউনিট অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল ও ডাক্তার-নার্সের অভাবে বর্তমানে শেরপুর সদর হাসপাতালের সেই কোটি কোটি টাকার ইউনিটগুলো সম্পূর্ণ অকেজো ও অচল হয়ে তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এই আইসিইউ ইউনিটটি এখন স্থানীয় মাদকসেবী ও বখাটেদের নিরাপদ আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে এবং সেখান থেকে হাসপাতালের অনেক মূল্যবান চিকিৎসা যন্ত্রপাতিও চুরি হয়ে যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, দালাল, চোর, ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের অবাধ যাতায়াতে হাসপাতালের একটি বড় অংশ বর্তমানে অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে এবং হাসপাতালের ঠিক পাশেই ময়লার উন্মুক্ত ডাস্টবিন থেকে ছড়ানো তীব্র দুর্গন্ধ সুস্থ মানুষকে আরও বেশি অসুস্থ করে তুলছে। গত ২০১৮ সালের পর থেকে রহস্যজনক কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সদর হাসপাতালে স্বাস্থ্য বিভাগের নতুন কোনো স্টাফ বা কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ডা. সানসিলা জেবরিন ক্ষোভ প্রকাশ করে সংসদকে জানান যে, গত আট বছরে অন্তত ছয় বারের মতো সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হলেও কোনো এক অজ্ঞাত ও অদৃশ্য শক্তির নেতিবাচক প্রভাবে পরীক্ষাটি বারবার স্থগিত বা পিছিয়ে যায়, যার খেসারত দিতে হচ্ছে শেরপুরের সাধারণ জনগণকে। তিনি অবিলম্বে এই অদৃশ্য শক্তির উৎস খুঁজে বের করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আইসিইউ ইউনিটটি চালুর মাধ্যমে শেরপুরবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।