মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনার জন্ম দিয়ে দেশের বিতর্কিত নির্বাচন জালিয়াতি ইস্যু নিয়ে লাইভ অনুষ্ঠানে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ চাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি নিউজের অত্যন্ত জনপ্রিয় টকশো ‘মিট দ্য প্রেস’–এর একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার মাঝপথে বয়কট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেছেন। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর ও নাটকীয় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যে ধারণ করা এবং রোববার টেলিভিশনের পর্দায় প্রচারিত ওই বহুল আলোচিত সাক্ষাৎকারে এনবিসির তারকা উপস্থাপক ক্রিস্টেন ওয়েলকার ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নির্বাচন এবং ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ‘কারচুপির মাধ্যমে হয়েছে’—এমন পুরনো ও অনড় দাবির বিষয়ে ট্রাম্পের কাছে সরাসরি কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তোলেন। ট্রাম্প তখন ক্ষোভ প্রকাশ করে দাবি করেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় ভোট গণনা শেষ হতে অযথা কয়েক দিন লেগে যাচ্ছে, যা তাঁর মতে অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক। তবে উপস্থাপক ক্রিস্টেন সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্পের এই যুক্তি খণ্ডন করে জানান যে, এটি ক্যালিফোর্নিয়ার প্রচলিত আইনি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং স্বাভাবিক অংশ।
উপস্থাপিকার এমন জবাবের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা অভিযোগ তুলে বলেন যে, শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনই নয়, রাজ্যটির গভর্নর নির্বাচনও বড় ধরনের কারচুপির শিকার হয়েছে। তবে লাইভ অনুষ্ঠানে এই গুরুতর দাবির পক্ষে তাঁর কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট বা দাপ্তরিক প্রমাণ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সরাসরি উপস্থাপক ক্রিস্টেন ওয়েলকারকে ‘অসৎ’ বলে আখ্যা দেন। ট্রাম্প ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী কর্মকর্তারা অসৎ, তুমিও অসৎ এবং তোমাদের পুরো মূলধারার সংবাদমাধ্যমই চরম অসৎ, এমনকি ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানটিও একটি অসৎ মাধ্যম। ওই সময় ওয়েলকার নিজের নিরপেক্ষ অবস্থান ব্যাখ্যা করে আরও সম্পূরক প্রশ্ন করার চেষ্টা করলে ট্রাম্পের ক্ষোভের পারদ আরও বৃদ্ধি পায় এবং তিনি বলেন, তুমি হয় একজন চরম অসৎ নারী, নয়তো অত্যন্ত বোকা; কারণ তুমি খুব ভালো করেই জানো এই নির্বাচনগুলো সূক্ষ্মভাবে কারচুপি করা হয়েছে এবং তোমাদের পুরো টিভি নেটওয়ার্কও পর্দার আড়ালে এই সত্যটি খুব ভালো করেই জানে। পরে ট্রাম্প আবারও ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের বিজয়ের পুরোনো দাবি পুনরাবৃত্তি করেন, যদিও আমেরিকার শীর্ষ আদালত ও বিভিন্ন স্বাধীন তদন্তে সেই দাবির পক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে উপস্থাপিকা আরও কিছু নতুন প্রশ্ন করতে উদ্যত হলে ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে সামগ্রিকভাবে ‘অসৎ’ বলে গালি দিয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে সাক্ষাৎকারটি শেষ করার একতরফা ঘোষণা দেন। নিজের শার্টে লাগানো লাইভ কলার মাইক্রোফোনটি টান মেরে খুলে ফেলে তিনি চরম বিরক্তি নিয়ে বলেন, আমাদের সাক্ষাৎকার এখানেই শেষ করি, আমার আর শোনার মতো যথেষ্ট ধৈর্য নেই, ধন্যবাদ এবং ভালো থাকবেন। উপস্থাপক ক্রিস্টেন তখন ট্রাম্পকে মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন যে, তিনি এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি নেওয়ার জন্য সুদূর ওয়াশিংটন থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে উইসকনসিন পর্যন্ত এসেছেন। জবাবে ট্রাম্প উল্টো বিরক্তি প্রকাশ করে বলেন, আমি তোমার অনুরোধে এক ঘণ্টা যাবত এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে খোলা জায়গায় বসেছিলাম এবং তোমাকে আমার মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ দিয়েছি, তাই তোমাদের মতো সংবাদমাধ্যমের আচরণ সবার আগে ঠিক করা উচিত।
মূলত সাক্ষাৎকারের একদম শুরুর দিক থেকেই ট্রাম্প বেশ বিরক্তি প্রকাশ করছিলেন, যখন ওয়েলকার ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে বর্বরোচিত হামলায় জড়িত এবং দায়িত্বরত পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর হামলার দায়ে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘অ্যান্টি-ওয়েপোনাইজেশন ফান্ড’ থেকে অর্থ সহায়তার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ট্রাম্প কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেন, দাঙ্গাকারীদের মূলত এফবিআই (FBI) এজেন্টরাই ক্যাপিটল ভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং দীর্ঘ কারাদণ্ডের ভয়েই আসামিরা আদালতে নিজেদের দোষ স্বীকার করেছিলেন। ট্রাম্পের ভাষায়, তারা কেন নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেছে তা কি আপনি জানেন, কারণ তাদের সরকারি আইনজীবীরা হুমকি দিয়ে বলেছিল যে তাদের ১৫ বছর কারাগারে পচতে হবে, তারা মূলত ভয় পেয়েছিল এবং তাদের সুপরিকল্পিতভাবে ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল। তবে মার্কিন করদাতাদের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে ওই ক্যাপিটল হিলের অপরাধীদের আইনি সহায়তা দেওয়া নৈতিকভাবে ঠিক কি না—এ প্রশ্নের কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে ট্রাম্প এড়িয়ে যান, এবং এই উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার বিষয়ে এনবিসি নিউজের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।